ইসলাম ও রবীন্দ্রনাথ


Momtaj Uddin Ahamad প্রকাশের সময় : মার্চ ২৭, ২০২৩, ৮:৪৭ পূর্বাহ্ন /
<strong>ইসলাম ও রবীন্দ্রনাথ</strong>

।। মমতাজ উদ্দিন আহমদ ।।

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্যিক প্রতিভা নয়, রবীন্দ্রনাথ মানুষটি কেমন ছিলেন, তাঁর গোঁফ-দাড়ি-আলখাল্লার ভেতরে নিজস্ব রূপটি কী, তাই জানার চেষ্টা করেছি এতদিন। বুদ্ধ, খৃষ্ট ও নানক সম্পর্কে কবির মতামত আমরা অনেক জেনেছি; কিন্তু হজরত মুহাম্মদ (সাঃ) সম্পর্কে তিনি কী ভাবতেন তা এতদিন জানা যায়নি।

একসময় অবিভক্ত ভারতে ফাতেহাদোয়জদহমে অর্থাৎ হজরত মুহাম্মদের (সাঃ) জন্মদিনের অনুষ্ঠানে ‘কোন্ আলোতে প্রাণের প্রদীপ জ্বালিয়ে তুমি ধরায় আসো’ গানটিও গাওয়া হত ৷ রবীন্দ্রনাথ ইরানের সুফিদের দ্বারা বিশেষভাবে প্রভাবিত হন। লালন ফকির, সিরাজ সাঁই প্রমুখ সব সাধক-গাইয়েরা রবীন্দ্রনাথের অতি আপনজন ছিলেন ।

ভারতীয় লেখক অমিতাভ চৌধুরী তাঁর লেখা ‘ইসলাম ও রবীন্দ্রনাথ’ গ্রন্থে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ) সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের ভাবনার বিষয়টি খোলাসা করেছেন।

তিনি বলেছেন, মুসলমান-সমাজ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের ধারণা কেমন ছিল, বইতে তা বিশদভাবে উল্লেখ করেছি। রবীন্দ্রনাথ নিজে কি হজরত মুহাম্মদ (সাঃ) সম্পর্কে কিছু লিখেছেন বা বলেছেন কোথাও? হ্যাঁ, লিখেছেন, আমি তার তিনটি সাক্ষ্য পেয়েছি। কিন্তু সে বাণী হিসেবে।

লেখক অমিতাভ চৌধুরীর অভিমত, রবীন্দ্রনাথ সম্ভবত বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) সম্পর্কে লিখতে কিছু দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন। তার কারণ লেখার কোথাও কোনপ্রকার স্খলন ঘটলে মুসলমান সমাজ তাঁকে ক্ষমা করত না। ইসলামের কঠোর অনুশাসনে তিনি সম্ভবত লেখার উৎসাহ পাননি । তবু তিনি অন্তত তিনটি ক্ষেত্রে ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে তাঁর মনের কথা জানাতে পেরেছিলেন।

হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) সম্পর্কে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের অনুরাগ সম্পর্কীত তিনটি বাণীর কথা উল্লেখ করা হয়েছে ‘ইসলাম ও রবীন্দ্রনাথ’ গ্রন্থে। এ তিনটি বাণী নিম্নরূপ:

  • ১.

১৯৩৩ সালের ২৬ নভেম্বর বোম্বাইয়ে এক জনসভা হয়। উদ্দেশ্য ‘পয়গম্বর দিবস’ উদযাপন। এই দিবসের জনসভায় সভাপতিত্ব করেন বিচারপতি মির্জা আলি আকবর খাঁ। এই সভায় রবীন্দ্রনাথ একটি বাণী পাঠান।

সেই বাণীটি সভায় পাঠ করেন সেকালের বিখ্যাত কংগ্রেস নেত্রী শ্রীমতী সরোজিনী নাইডু। বাণীটি হল-

“জগতে যে সামান্য কয়েকটি মহান ধর্ম আছে, ইসলাম ধর্ম তাদেরই অন্যতম । মহান এই ধর্মমতের অনুগামীদের দায়িত্বও তাই বিপুল। ইসলামপন্থীদের মনে রাখা দরকার, ধর্মবিশ্বাসের মহত্ত্ব আর গভীরতা যেন তাঁদের প্রতিদিনের জীবনযাত্রার ওপরও ছাপ রেখে যায়। আসলে, এই দুর্ভাগা দেশের অধিবাসী দুটি সম্প্রদায়ের বোঝাপড়া শুধু তো জাতীয় স্বার্থের সপ্রতিভ উপলব্ধির ওপর নির্ভর করে না ; সত্যদ্রষ্টাদের বাণীনিঃসৃত শাশ্বত প্রেরণার ওপরও তার নির্ভরতা। সত্য ও শাশ্বতকে যাঁরা জেনেছেন ও জানিয়েছেন, তাঁরা ঈশ্বরের ভালবাসার পাত্র। এবং মানুষকেও তাঁরা চিরকাল ভালবেসে এসেছেন।

  • ২.

১৯৩৪ সালে রবীন্দ্রনাথ একটি বাণী পাঠিয়ে হজরত মুহাম্মদের (সাঃ) প্রতি তাঁর বিনম্র শ্রদ্ধা জানান। এই বাণী লেখার অনুরোধ আসে কলকাতার বিখ্যাত ব্যারিস্টার স্যার আবদুল্লাহ্ সুহরওয়ার্দির কাছ থেকে। বাণীটি ২৫ জুন ফতেহাদোয়াজদহম, অর্থাৎ হজরত মুহাম্মদের (সাঃ) জন্মদিন উপলক্ষে বেতারে সম্প্রচারিত হয়। বাণীটি হল-

“ইসলাম পৃথিবীর মহত্তম ধর্মের মধ্যে একটি। এই কারণে তার অনুবর্তিগণের দায়িত্ব অসীম, যেহেতু আপন জীবনে এই ধর্মের মহত্ত্ব সম্বন্ধে তাঁদের সাক্ষ্য দিতে হবে। ভারতে যে-সকল বিভিন্ন ধর্মসমাজ আছে, তাদের পরস্পরের প্রতি সভ্যজাতিযোগ্য মনোভাব যদি উদ্ভাবিত করতে হয়, তাহলে কেবলমাত্র রাষ্ট্রিক স্বার্থবুদ্ধি দ্বারা তা সম্ভব হবে না, আমাদের নির্ভর করতে হবে সেই অনুপ্রেরণার প্রতি, যা ঈশ্বরের প্রিয়পাত্র ও মানবের বন্ধু সত্যদূতদের অমর জীবন থেকে চির- উৎসারিত। আজকের এই পুণ্য অনুষ্ঠান উপলক্ষে মুসলিম ভাইদের সঙ্গে একযোগে ইসলামের মহাঋষির উদ্দেশ্যে আমার ভক্তি উপহার অর্পণ করে উৎপীড়িত ভারতবর্ষের জন্য তাঁর আশীর্বাদ ও সান্তনা কামনা করি।”

  • ৩.

নয়াদিল্লীর জামে মসজিদ থেকে প্রকাশিত পয়গম্বর সংখ্যার জন্য রবীন্দ্রনাথ ১৯৩৬ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি শান্তিনিকেতন থেকে একটি শুভেচ্ছাবার্তা পাঠান। সেই বার্তায় পয়গম্বর হজরত মহম্মদ সম্পর্কে সশ্রদ্ধ উক্তি আছে। সেই বার্তায় রবীন্দ্রনাথ বলেছেন—

“যিনি বিশ্বের মহত্তমদের অন্যতম, সেই পবিত্র পয়গম্বর হজরত মুহাম্মদের (সাঃ) উদ্দেশ্যে আমি আমার অন্তরের গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করি। মানুষের ইতিহাসে এক নতুন, সম্ভাবনাময় জীবনীশক্তির সঞ্চার করেছিলেন পয়গম্বর হজরত, এনেছিলেন নিখাদ, শুদ্ধ ধর্মাচরণের আদর্শ। সর্বান্তঃকরণে প্রার্থনা করি, পবিত্র পয়গম্বরের প্রদর্শিত পথ যাঁরা অনুসরণ করছেন, আধুনিক ভারতবর্ষের সুসভ্য ইতিহাস রচনা করে তাঁরা যেন জীবন সম্পর্কে তাঁদের গভীর আস্থা এবং পয়গম্বরের প্রদত্ত শিক্ষাকে যথাযথ মর্যাদা দেন । তাঁরা যেন এমনভাবে ইতিহাসকে গড়ে তোলেন যাতে আমাদের জাতীয় জীবনে শান্তি ও পারস্পরিক শুভেচ্ছার বাতাবরণটি অটুট থেকে যায়।”

নোট: লেখকের বইতে ‘(সাঃ)’ শব্দটি নেই। হযরত মুহাম্মদের (সাঃ) নাম উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে “(সাঃ)” বলা মুসলমানদের জন্য বাধ্যতামূলক। তাই বইয়ের রেফারেন্সে “(সাঃ)” সংযুক্ত করা হয়েছে।

উৎসঃ ইসলাম ও রবীন্দ্রনাথ অন্যান্য প্রসঙ্গ, পৃষ্ঠা: ২-৩।