উচ্চ শিক্ষার প্রসার, শিক্ষানুরাগ ও বকলমের জমিদান


Momtaj Uddin Ahamad প্রকাশের সময় : ডিসেম্বর ২৩, ২০২৩, ৬:১৩ পূর্বাহ্ন /
উচ্চ শিক্ষার প্রসার, শিক্ষানুরাগ ও বকলমের জমিদান

মোহাম্মদ শাহী নেওয়াজ

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের এক অপরূপ লীলাভূমি পার্বত্য চট্টগ্রাম। দেশের মোট আয়তনের একদশমাংশ এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এ জনপদ। ভৌগোলিক কারণে এ জনপদ অনগ্রসর ও প্রশ্চাৎপদ। পার্বত্য চট্টগ্রাম দেশের ৩ (তিন) টি প্রশাসনিক জেলা যথা: বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি এর সমন্বয়ে গঠিত।

পাহাড়ি কন্যা বান্দরবান দেশের পার্বত্যজেলা সমূহের মধ্যে অন্যতম (আলীকদম এ জেলার একটি অন্যতম উপজেলা। সম্প্রতিক স্থানীয় উদ্যোগে এ এলাকায় একটি মহাবিদ্যালয় স্থাপন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। স্থানীয় মহলে এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও চাঞ্চল্যতা বিরাজ করছে।

তৎকালীন সামরিক সরকার এ দেশে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের লক্ষ্যে প্রশাসনিক সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করে। ১৯৮৩ সালে আলীকদম একটি প্রশাসনিক উপজেলা হিসেবে মর্যাদা লাভ করে। স্থাপিত হয় বহু মাধ্যমিক, নিম্নমাধ্যমিক, মাদ্রাসা ও প্রাথমিক বিদ্যালয়। তবে অদ্যবদি কোন মহাবিদ্যালয় বা কলেজ স্থাপিত হয়নি।

এ পাহাড়ী জনপদে বসবাসকারী সুশীল সমাজ ও সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের এক অভিন্ন দাবী। এলাকয় একটি কলেজ স্থাপন করা। সর্ব সাধারণেরর দীর্ঘ আক্ষেপ! কখন এলাকায় একটি কলেজ গড়ে উঠবে? সর্বশেষ ২০২২ সালের আদমশুমারী অনুযায়ী এ জেলার মোট জনসংখ্যা ৪,৮০,৬০৯ জন।

বৈচিত্রময় এ জেলায় দীর্ঘকাল হতে মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও হিন্দু ধর্মের মানুষ শান্তিপূর্ণ সহ-অবস্থান করে আসছে। বান্দরবান দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য ক্ষেত্র। বিবিধ ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীর বসবাস এখানে। মারমা, চাকমা, চাক, বম, মুরং, ত্রিপুরা, খেয়াং, ঘুমি ও লুসাই সম্প্রদায়ের পারস্পরিক সুসম্পর্ক ও বৈচিত্রময় সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ এ জনপদ।

আলীকদম দেশের কোন বিচ্ছিন্ন জনপদ নয় বরং পার্বত্য অঞ্চলের একটি অন্যতম উপজেলা। জেলা শহর হতে ১১১ কি.মি. দূরত্বে এ উপজেলার অবস্থান। এখানে ৩ টি মাধ্যমিক, ১ টি দাখিল মাদ্রাসা, ১ টি নিম্ন-মাধ্যমিক ও ৪১ টি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে। কিন্তু কলেজ শূন্য এ উপজেলা। স্বাধীনতার দীর্ঘ ৫০ বছর অতিক্রান্ত হলেও এলাকায় কোন কলেজ বা মহাবিদ্যালয় গড়ে উঠেনি। ফলে প্রশ্চাৎপদ এ জনপদে উচ্চ শিক্ষার হার অতি নগন্য। স্থানীয় শিক্ষার্থীগণ দিন দিন উচ্চ শিক্ষার সুযোগ হতে বঞ্চিত হচ্ছে। কলেজ স্থাপনে অন্যতম বিপত্তি উপযুক্ত জমির সংস্থান।

৮৮৫.৭৮ বর্গ কিঃ মিঃ আয়তন বিশিষ্ট এ উপজেলা। অথচ একটি মহাবিদ্যালয় স্থাপনে জমির সংকট। স্থানীয় নেতৃত্বদানকারীগণ একটি মহাবিদ্যালয় স্থাপন উপযোগী জমির যোগান দিতে দীর্ঘ সময় নিয়েছেন। যার প্রভাব এ উপজেলার সাক্ষরতার হার মাত্র ৩১.৩ শতাংশ, যেখানে জাতীয় সাক্ষরতার হার ৭৬.৮ শতাংশে উপনীত হয়েছে।

বাবু বীরবাহাদুর উশৈ সিং বান্দরবান পার্বত্য জেলার অবিসংবাদিত মহান নেতা। তাঁকে স্থানীয় জনতা ‘পার্বত্য বীর’ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করেছে এবং যিনি সরকারের পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত।

এ জনপ্রিয় নেতা শুধু পার্বত্য অঞ্চলের রাজনৈতিক অঙ্গনে নয়, সমগ্র দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক বিরল ব্যক্তিত। এক জনপ্রিয় নেতা দেশে একই রাজনৈতিক দল ও একই সংসদীয় আসন হতে বার বার নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে অন্যতম।

তিনি এ অঞ্চলের শিক্ষা, সাংস্কৃতি, অর্থনীতি, যোগাযোগ, অবকাঠামো ও অন্যান্য সকল উন্নয়নের অন্যতম রূপকার। সরকারী ও সাংগঠনিক সফর কালে নেতা একাধিক বক্তব্যে স্থানীয় উদ্যোগে একটি কলেজ স্থাপনে তাগিদ প্রদান করেন। বিশেষ স্মরণীয় যে, বিগত ২০০৩ সালের স্থানীয় চৈক্ষ্যং ইউনিয়নের সম্মুখে আয়োজিত জনসভায় এ এলাকায় কলেজ স্থাপনে স্থানীয় উদ্যোগহীনতায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি ঐ জনসভায় দৃপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেন “আপনারা আমাকে জমি দেন, আমি আপনাদের কলেজ দিব”।

স্থানীয় মহলে শুভবুদ্ধির উদয় হয়েছে। অবশেষে সাড়া দিলেন স্থানীয় ব্যক্তিগণ। পার্বত্য আলীকদম উপজেলায় কলেজ বা মহাবিদ্যালয় স্থাপন এখন কোন স্বপ্ন নয় বরং বাস্তব। অনগ্রসর এলাকার অনন্য স্বপ্ন পূরণে এগিয়ে এসেছেন অনেকেই। বিশেষত একটি উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপনের ভূমিগত প্রতিবন্ধকতা নিরসনে এগিয়ে এসেছেন কয়েক মহৎপ্রাণ। যাঁরা এগিয়ে এসেছেন তাদের মধ্যে অন্যতম জনাব আনসার আলী। তিনি পেশায় একজন কৃষক, ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী কিন্তু নিরক্ষর।

‘আলীকদম কলেজ’ প্রতিষ্ঠায় এ নিরক্ষর ব্যক্তি নিজস্ব ২ একর জমি প্রতিষ্ঠানের নামে স্বেচ্ছায় দান করেছেন। এ দানের অন্যতম প্রেরণা শিক্ষানুরাগ। তাঁর এরূপ নিঃশর্ত দান প্রশংসিত হয়েছে সর্বমহলে। এ নিরক্ষর ব্যক্তির কলেজ প্রতিষ্ঠর প্রচেষ্টা ও শিক্ষার প্রতি অনুরাগ শুধু কোন পার্বত্য এলাকা নয় বরং সমগ্র দেশের জন্য অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত।

এ সংবাদ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক, সংবাদপত্র ও সংবাদ চ্যানেলে বিশেষ গুরুত্ব সহকারে প্রকাশিত হয়েছে। সর্বশেষ তথ্য মতে এ প্রস্তাবিত কলেজের অনুকূলে মোট ৬.০৪ একর জমি দানমূলে দলিল সম্পাদিত হয়েছে। স্থানীয় বীর মুক্তিযুদ্ধা আব্দুল মান্নান, মৃত আবুল কাশেমের ওয়ারিশ গং ও কালুর ওয়ারিশগণ পৃথক পৃথক দলিল মূলে স্বপ্রণোদিত দানের মাধ্যমে এ বিদ্যাপীঠ স্থাপনে এগিয়ে এসেছেন।

পার্বত্য আলীকদম আমার অতি প্রিয় স্থান এবং পরিবারের অভিচ্ছেদ্য অংশ। এ জনপদ শুধু আমার কর্মস্থল নয়, আমার প্রয়াত পিতার কর্মক্ষেত্র ছিল। বাবার দীর্ঘ কর্মজীবনে এ জনপদের সমাজ ও সংস্কৃতির সাথে নিবিড়ভাবে মিশে ছিলেন। এ সমাজ-সংস্কৃতির সাথে পারিবারি ও সামাজিক বন্ধনে আবদ্ধ। দীর্ঘকাল এ সমাজের সাথে একত্রে বসবাস করে আসছি। তাই এ সমাজের নিকট পারিবারিক দায়বদ্ধতা।

এ জনপদে একটি কলেজ স্থাপনে আমি ব্যক্তিগতভাবে উচ্ছাসিত। এলাকায় একটি মহাবিদ্যালয় স্থাপনকে ব্রত হিসেবে নিয়েছেন এক মহৎপ্রাণ সাংবাদিক। মমতাজ উদ্দিন আহমদ নামের গুণী সাংবাদিক একটি অনগ্রসর এলাকায় উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপনে স্থানীয় জনমত তৈরী যাচ্ছেন। তিনি একটি কলেজ স্থাপনে স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণের লক্ষ্যে ইতিবাচক সংবাদ পরিবেশন করে যাচ্ছেন। প্রান্তিক এলাকায় কলেজ স্থাপনে একজন সাংবাদিকের এরূপ প্রচেষ্টা অনুকরনীয় দৃষ্টান্ত।

এ কলেজ বাস্তবায়নে সাংগঠনিক কমিটির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন আমার পরম শ্রদ্ধেয় ও প্রিয় বড়ভাই জনাব জামাল উদ্দীন। উচ্চশিক্ষিত, সজ্জন ও শান্তিপ্রিয় জনপ্রতিনিধি হিসেবে তিনি এলাকায় সমাদৃত। বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রীধারী এ জনপ্রতিনিধি হিসেবে এলাকায় কলেজ স্থাপনে স্থানীয় পক্ষসমূহ ও প্রশাসনের সর্বস্তরে সাথে সুসমন্বয় করছেন। শুধু তাই নয় একজন উদ্যোক্তা ও দাতা হিসেবে তিনি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

শিক্ষা হচ্ছে একটি এলাকার সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম মাধ্যম। শিক্ষা সমাজ, সভ্যতা ও সংস্কৃ তির উন্নয়নে অনন্য ভূমিকা পালন করে। তাই শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ সামাজিক উন্নয়নে সর্বশ্রেষ্ঠ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত। কোন অনগ্রসর এলাকার শিক্ষার প্রসারে স্থানীয় উদ্যোগ অতি জরুরী।

স্থানীয় উদ্যোগ ব্যতিত রাষ্ট্রীয় প্রচেষ্টা সফল হয় না। সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে যে কোন বিদ্যাপীঠ সমাজ উন্নয়নের অন্যতম হাতিয়ার। সমাজের সুবিধাভোগী আমরা কিন্তু আনসার আলীর মত সমাজ হিতৈষীদের কাছে সকলে পরাজিত। আনসার আলী আমার নিকট প্রেরণা। তাই এলাকায় কলেজ স্থাপনে আমিও সাধ্যমত সহায়তার অঙ্গীকার করছি।

বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষার স্তরসমূহ প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা হিসেবে বিন্যস্ত। প্রান্তিক অনগ্রসর এলাকায় শিক্ষা স্তরের ধারাবাহিক প্রথম ৩ (তিন) স্তর না থাকলে উচ্চ শিক্ষার সুযোগ ব্যহত হবে। এলাকার শিক্ষার প্রসার, সাংস্কৃতিক চর্চা, সামাজিক উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন ব্যহত হবে। অনগ্রসর জনপদে মহাবিদ্যালয় স্থাপনের ফলে রাষ্ট্রের সামগ্রীক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে।

যুগে যুগে সমাজ সভ্যতার ক্রমবিকাশ ঘটছে। সময়ের প্রয়োজনে সমাজ পরিবর্তিত হয়। সময়ের চাহিদা অনুযায়ী সমৃদ্ধ সমাজ প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসে অনেকেই। দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তিরাই সমাজ সংস্কারমূলক কর্মেও সৃজনকারী। সভ্যতার বিকাশে যাদের ভূমিকা অনন্য তাঁরাই সমাজ হিতৈষী এবং কালের সাক্ষী। মানুষের জন্য ইতিহাস রচিত হয়, ইতিহাসের জন্য মানুষ নয়। মানুষের কীর্তিকলাপ মানুষেই বিচার করবে, যখন কোন উদ্ভাবনী সত্ত্বার অবসান ঘটবে। মানুষ মহৎ কর্ম বা সৎ কর্ম সাধন করে। এ জগৎ সাধিত কর্মে যোগ্য মর্যাদা পাওয়ার উপযুক্ত স্থান নয়। সম্পাদিত সকল হীত কর্মের যথার্থ স্বীকৃতির অনন্য ক্ষেত্র মহাকাল। বকলম আনসার আলী ও মুক্তিযোদ্ধা মান্নান গং সময়ের আবর্তে নিশ্চিহ্ন হবেন। কিন্তু মহান স্রষ্টা শ্রেষ্ঠ বিচারক। ইহকালীন কল্যাণধর্মী সকল উদ্যেগের স্বীকৃতি নিজ হাতে অর্পন করবেন। জয়হোক সমাজহিতৈষী ব্যক্তিত্বের। সুনিশ্চিত অনগ্রসর এলাকার উচ্চ শিক্ষার প্রসার।