ইসলামের ইতিহাসে শাম, ফিলিস্তিন ও গাজা


Momtaj Uddin Ahamad প্রকাশের সময় : নভেম্বর ১০, ২০২৩, ৯:২৬ পূর্বাহ্ন /
ইসলামের ইতিহাসে শাম, ফিলিস্তিন ও গাজা

মুফতি আরিফ খান সাদ

পৃথিবীজুড়ে ইহুদি, খ্রিষ্টান ও মুসলিম—এ তিন ধর্মের মানুষের কাছেই ফিলিস্তিন আবেগের জায়গা। ইবরাহিমীয় তিন ধর্মেই জেরুজালেম নগরীর সমান আবেদন। সবাই একে পবিত্র নগরী ও পুণ্যভূমি বলে বিশ্বাস করে। এ মাটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রাচীন এ তিন ধর্মের বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও ইতিহাস।

ইতিহাসবিদদের মতে, নবী হজরত নুহ (আ.)-এর সময়ে সংঘটিত মহাপ্লাবনের পর তার তিন পুত্র হাম, শাম, ইয়াফেসের মাধ্যমে পৃথিবীতে মানবসভ্যতার পুনর্জাগরণ ঘটে। নুহ (আ.)-এর পুত্র শামের নামে গড়ে ওঠে শামদেশ ও সেমেটিক সভ্যতা। প্রাচীন সেমেটিক সভ্যতার সেই শামদেশ বর্তমানে ভেঙে চারটি দেশ—সিরিয়া, জর্ডান, লেবানন, ফিলিস্তিন-ইসরায়েল এবং আরও চারটি দেশ—ইরাক, তুরস্ক, মিশর, সৌদি আরবের অংশবিশেষ জুড়ে বিস্তৃত ও বিভক্ত। ইসলামে এই অখণ্ড শামকে বলা হয়েছে ‘বরকতময় ভূমি’।

কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘পবিত্র ও মহিমাময় তিনি, যিনি তার বান্দাকে রাতে ভ্রমণ করিয়েছেন মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসা পর্যন্ত। যার পরিপার্শ্বকে আমি করেছি বরকতময়, তাকে আমার নিদর্শন দেখানোর জন্য; তিনিই সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।’ (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ১)। রাসুল (সা.) এক সাহাবিকে বলেছেন, ‘তুমি শামদেশে গিয়ে বসবাস করবে। কেননা তা আল্লাহর অন্যতম পছন্দনীয় ভূমি। সেখানে তিনি তার সর্বোৎকৃষ্ট বান্দাদের একত্র করবেন।’ (আবু দাউদ, হাদিস: ২৪৭৬)।

কেয়ামতের পর যখন হাশরের ময়দানে পৃথিবীর সব মানুষকে সমবেত করা হবে, তখন তার কেন্দ্রস্থল হবে এই শামভূমি। সাহাবি আবু জর গিফারি (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘শাম হলো সমাবেশ ও পুনরুত্থানের ভূমি।’ (মুসনাদে আহমাদ: ২০০৪৩)। পৃথিবীর ইতিহাসের শুরু-শেষ এবং মহাপ্রলয় শেষে পুনরুত্থানের পরও বহু ঘটনার সাক্ষী এই শামভূমি ও ফিলিস্তিন। পৃথিবীর প্রথম মানুষ হজরত আদম (আ.)-এর হাতে শামভূমিতে প্রতিষ্ঠিত হয় পৃথিবীর দ্বিতীয় স্থাপনা—মসজিদুল আকসা।

তারপর সেখানে মানবসভ্যতার সূচনা হয় নুহ (আ.)-এর সময়ের মহাপ্লাবনের পর। আরব থেকে কেনানি জাতিগোষ্ঠী ভূমধ্যসাগরের তীরবর্তী ওই অঞ্চলে গিয়ে বসতি স্থাপন করে। কেনানিদের থেকে আশপাশের অঞ্চলে বিকাশ লাভ করে প্রাচীন ফিনিশিয়ান, ব্যাবিলনীয়, মিশরীয়, আরামায়িক সভ্যতা। আরামায়িক সভ্যতা কোরআনে যাদের বলা হয়েছে ‘ইরামা জাতিল ইমাদ’, তাদের একটি সম্প্রদায়ের হাতে গোড়াপত্তন হয় হেকসোস সভ্যতা ও ‘উর-শালিম’ নগরীর, যার প্রচলিত উচ্চারণ জেরুজালেম।

কেনানি জাতিগোষ্ঠীর দেশ এ জেরুজালেম নগরীতে খ্রিষ্টপূর্ব ১৯০০ অব্দে ইরাক থেকে হিজরত করেন নবী ইবরাহিম (আ.)। তখন ছিল হেকসোসদের শাসনামল। এখানেই জন্মগ্রহণ করেন ইবরাহিম (আ.)-এর দুই স্ত্রীর গর্ভে দুই পুত্র ইসমাইল (আ.) ও ইসহাক (আ.)। দ্বিতীয় স্ত্রী হাজেরা ও প্রথম সন্তান ইসমাইল মক্কা নগরীতে হিজরত করেন এবং সেখানে তার বংশ থেকে দুই হাজার বছর পর জন্মগ্রহণ করেন শেষ নবী হজরত মুহম্মদ (সা.)। অন্যদিকে ফিলিস্তিনে ইবরাহিম (আ.)-এর অন্য সন্তান ইসহাক (আ.)-এর ঔরস থেকে জন্মগ্রহণ করেন নবী ইয়াকুব (আ.)।

হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর জীবদ্দশায়ই জন্মগ্রহণ করেন নাতি ইয়াকুব (আ.) এবং তারই প্রসিদ্ধ উপাধি হচ্ছে ‘ইসরাইল’। হিব্রু ভাষার এ শব্দটির অর্থ ‘আল্লাহর বান্দা’। ইসরাইল তথা ইয়াকুব (আ.)-এর ছিল ১২ সন্তান। এই ১২ সন্তানকেই বলা হয় ‘বনি ইসরাইল’ অর্থাৎ ‘ইসরাইলের সন্তানরা’। ইসরাইলের ১২ সন্তানের একজন হচ্ছেন নবী ইউসুফ (আ.) এবং আরেক সন্তানের নাম ইয়াহুদা, যার থেকে উদ্ভব হয়েছে ‘ইহুদি জাতি’। ইবরাহিম-পরবর্তী দুই হাজার বছরের ইতিহাসে সেখানে এ বংশে আরও অনেক নবীর জন্ম হয়। যেমন, হজরত মুসা, হারুন, দাউদ, সোলায়মান এবং সর্বশেষ ইসা (আ.)।

বংশ পরম্পরায় এসব নবীর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইবরাহিম (আ.) থেকে উৎসারিত তিন ধর্মের বিশ্বাস ও ইতিহাস। ফিলিস্তিনের ‘কুদস’ তথা জেরুজালেম নগরী মুসলমানদের তৃতীয় পবিত্র স্থান। এই কুদস নগরীতেই অবস্থিত ঐতিহাসিক ‘মসজিদুল আকসা’। ইহুদি ও খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীদের কাছেও মসজিদুল আকসা আবেগের জায়গা। কারণ এ মসজিদ ঘিরে তিন ধর্মেরই রয়েছে প্রাচীন ইতিহাস, ঐতিহ্য ও শিকড়ের সম্পর্ক।

মসজিদুল আকসা অসংখ্য নবী-রাসুলের স্মৃতিধন্য পুণ্যভূমি। এ মসজিদ ঘিরে আছে নবী দাউদ ও সোলায়মান (আ.)-এর রাজ্যশাসনের স্মৃতি, নবী ইসা (আ.)-এর জন্মের স্মৃতি ও নবী মুহম্মদ (সা.)-এর ঐতিহাসিক মিরাজ ভ্রমণের স্মৃতি। এই জেরুজালেম নগরীতে আছে ইহুদিদের ধ্বংসপ্রাপ্ত টেম্পল, সেখানেই অবস্থিত খ্রিষ্টানদের পবিত্র গির্জা হোলি সেপালকার ও তাদের পবিত্র ম্যারির কবর। এই আকসা ছিল মুসলমানদের প্রথম কিবলা; হিজরতের পর ১৭ মাস পর্যন্ত মুসলমানরা মসজিদুল আকসার দিকে ফিরে নামাজ আদায় করত।

নবী দাউদ ও সোলায়মান (আ.)-কে ইহুদিরা তাদের ধর্মীয় পুরোধা হিসেবে স্মরণ করে, নবী ইসা (আ.)-কে খ্রিষ্টানরা তাদের ধর্মীয় পুরোধা হিসেবে স্মরণ করে। আর মুসলমানরা উপরোক্ত দুই ধর্মের নবীকেও বিশ্বাস করে এবং শেষ নবী হজরত মুহম্মদ (সা.)-কেও বিশ্বাস করে। বলা যায়, পৃথিবীর বিশাল তিন ধর্মের জনগোষ্ঠীর স্রোতপ্রবাহ ফিলিস্তিনে এসে আছড়ে পড়েছে।

তিন সমুদ্রের মোহনা এক জায়গায় আছড়ে পড়লে যেমন সমুদ্র বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে, তেমনি আবহমান কাল থেকেই এ পুণ্যভূমি ঘিরে চলছে ক্রমাগত যুদ্ধ, সংঘাত, রক্তপাত ও জুলুম-নির্যাতনের ধারাপাত। তিন ধর্মের পবিত্র নগরী ফিলিস্তিনের মসজিদুল আকসা হাজার বছরের ইতিহাসে অনেকবার মালিকানা বদল হয়েছে। এ নগরী ঘিরে চলছে যুদ্ধ ও সন্ধি।

বনি ইসরাইল বংশের শেষ নবী হজরত ইসা (আ.)-এর পর থেকে এ অঞ্চলের ক্ষমতা ছিল রোমানদের হাতে। মুসলিমরা ফিলিস্তিন জয় করে দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর ফারুক (রা.)-এর শাসনামলে, হিজরি ১৬ এবং খ্রিষ্টীয় ৬৩৭ সালে। তখন আল-আকসা মুসলমানদের নিয়ন্ত্রণাধীন হয়। বিজয়ের পর খলিফা ওমর (রা.) ফিলিস্তিন সফর করেন। তখন তার সঙ্গে ছিলেন আবু উবাইদা আমের ইবনুল জাররাহ, সা’আদ বিন আবি ওয়াক্কাস, খালিদ বিন ওয়ালিদ ও আবু জর গিফারি (রা.)-সহ সাহাবিদের একটি দল।

ওমর (রা.) একটি সন্ধিচুক্তির অধীনে স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছ থেকে আল-আকসার মালিকানা গ্রহণ করেন এবং তিন ধর্মের লোকদেরই উপাসনার অধিকার প্রদান করেন। মুসলিমদের অধীনে আল-আকসা নিয়মতান্ত্রিকভাবে চলছিল। তবে ১০৯৯ খ্রিষ্টাব্দে খ্রিষ্টানরা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে আল-আকসা দখল করে এবং ইহুদি-মুসলিমদের ওপর ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। খ্রিষ্টানরা তখন প্রায় ৭০ হাজার মানুষকে হত্যা করে। ধ্বংস করে ইসলামের বহু ঐতিহ্যবাহী নিদর্শন। কেড়ে নেয় মুসলিম ও ইহুদিদের উপাসনার অধিকার।

৮৮ বছর পর ১১৮০ খ্রিষ্টাব্দে মিশরের শাসক সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবি (রহ.) পুনরায় খ্রিষ্টানদের হাত থেকে ফিলিস্তিন ভূমি মুক্ত করেন। তখন থেকে মুসলিম শাসকদের নিয়ন্ত্রণে ছিল মসজিদুল আকসা। ছিল তিন ধর্মের মানুষের উপাসনার অধিকার। তারপর ১৯১৭ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তুর্কিস্তানকেন্দ্রিক উসমানি খেলাফতের পরাজয় হলে আল-আকসার নিয়ন্ত্রণ চলে যায় ব্রিটিশদের হাতে।

ব্রিটিশরা সম্পূর্ণ অবৈধভাবে ফিলিস্তিনের একাংশে ইহুদিদের মালিকানা প্রদান করে এবং মসজিদুল আকসার দায়িত্ব হস্তান্তর করে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশদের মিত্র জর্ডানের শাসকের হাতে। ফলে মসজিদুল আকসা বর্তমানে জর্ডানের ওয়াকফ মন্ত্রণালয়ের মালিকানাধীন সম্পত্তি। তবে ১৯৬৭ সালে আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের পর মসজিদুল আকসার নিরাপত্তার দায়িত্ব ভাগ করে নেয় ইসরায়েল সরকার এবং মসজিদ পরিচালনার ভার প্রদান করে যৌথভাবে ইসলামী ওয়াকফ ট্রাস্টের হাতে। ইসলামের পবিত্র এ ভূমিতে ঐতিহাসিক, সংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও নানা কারণে এক অনিঃশেষ যুদ্ধ পরিস্থিতি বিরাজমান।

আজ থেকে একশ বছর আগেও পৃথিবীতে ‘ইসরায়েল’ নামে কোনো দেশের অস্তিত্ব ছিল না। ‘ইসরায়েল’ মূলত হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর নাতি ও হজরত ইউসুফ (আ.)-এর বাবা হজরত ইয়াকুব (আ.)-এর উপাধি। হজরত ইয়াকুব (আ.)-এর দুই ঘরে যথাক্রমে ১০ ও ২ জন পুত্রসন্তান ছিল। এ ১২ সন্তানকেই বাবার নামে মিলিয়ে বলা হয় ‘বনি ইসরাইল’।

১৮৯৭ সালে জায়োনিস্ট আন্দোলনের নেতা থিউডোর হার্জেল ইহুদিদের জন্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের দাবি উত্থাপন করেন এবং কল্পিত সে রাষ্ট্রের নাম প্রস্তাব করা হয় ইসরায়েল। তারপর প্রথম বিশ্বযুদ্ধে উসমানি খেলাফতের পতন হলে উসমানি খেলাফতের মালিকানাধীন ফিলিস্তিন ভূখণ্ডের দখল নেয় ব্রিটেন। ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী আর্থার বেলফোর ১৯১৭ সালের ২ নভেম্বর ফিলিস্তিনে ইহুদিদের অভিবাসনের ঘোষণা দেন। তখন সেখানে স্থানীয় ইহুদিদের সংখ্যা ছিল মাত্র ৩ শতাংশ। বেলফোর ঘোষণার পর শুরু হয় পৃথিবীর বিভিন্ন স্থান থেকে ইহুদিদের এনে ফিলিস্তিনে অভিবাসনের ধারাবাহিকতা।

বিভিন্ন দেশ থেকে আসা ইহুদিরা ফিলিস্তিনে দখলদার ব্রিটিশদের প্রত্যক্ষ মদদে জায়গা কিনে বসতি স্থাপন করতে থাকে এবং এভাবে ১০ শতাংশ জমির মালিক হয়ে যায়। কিন্তু ব্রিটেনের চেষ্টায় জাতিসংঘ ১০ শতাংশ জমির মালিকদের জন্য পুরো ফিলিস্তিনের অর্ধেকেরও বেশি ভূমি বরাদ্দ দিয়ে দেয়। এ অবস্থায় রাশিয়া থেকে অভিবাসী হয়ে আসা ইহুদি নেতা ডেভিড বেন গুরিয়েন ১৯৪৮ সালের ১৪ মে ইসরায়েলের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং তিনি হন ইসরায়েলের প্রথম প্রধানমন্ত্রী।

এতে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে আরব জনগোষ্ঠী এবং পরের দিন ১৫ মে পার্শ্ববর্তী পাঁচটি আরব রাষ্ট্র মিশর, ট্রান্স জর্ডান, লেবানন, সিরিয়া এবং ইরাক বাহিনী একযোগে ‘ইসরায়েল’ নামক নতুন ইহুদি রাষ্ট্রে আক্রমণ করে। যুদ্ধে আরবরা পরাজিত হয় এবং সাড়ে সাত লাখ ফিলিস্তিনি নাগরিক ভিটেমাটি হারিয়ে শরণার্থী হয়ে পড়ে। উপরন্তু প্রস্তাবিত ফিলিস্তিন রাষ্ট্রেরও বড় অংশ দখল করে নেয় ইসরায়েল। এভাবে ফিলিস্তিনের ৭৭ শতাংশ ভূমির ওপর অবৈধ দখলদারি প্রতিষ্ঠা করে নেয় উড়ে এসে জুড়ে বসা ‘ইসরায়েল’।

ইহুদিদের অবৈধ রাষ্ট্র ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার দিনটিকে অর্থাৎ ১৯৪৮ সালের ১৫ মে প্রতিবছর ‘নাকাবা দিবস’ তথা ‘বিপর্যয় দিবস’ পালন করে থাকে ফিলিস্তিনিরা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটিশরা ফিলিস্তিন ত্যাগ করার সময় মুসলমানদের নিরঙ্কুশ মালিকানায় থাকা আল-আকসাসহ জেরুজালেমের অধিকার ফিলিস্তিন-ইসরায়েল কাউকেই না দিয়ে এর আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণের ঘোষণা করে।

তবে এ ঘোষণার সময় জাতিসংঘের আইনে আল-আকসা ও জেরুজালেমের মালিকানা এককভাবে ফিলিস্তিনিদের হাতে না থাকলেও তার বাস্তব নিয়ন্ত্রণ এককভাবে মুসলমানদের হাতেই ছিল। আল-আকসায় কোনো ইহুদি প্রবেশ করতে পারত না। তা ছিল শুধুই মুসলমানদের। তারপর ১৯৬৭ সালে (৫ থেকে ১০ জুন পর্যন্ত) ‘ছয় দিনের যুদ্ধ’ নামে খ্যাত আরব-ইসরায়েল যুদ্ধে পরাজয়ের মধ্য দিয়ে আল-আকসার নিয়ন্ত্রণ হারায় মুসলমানরা।

ওই যুদ্ধের মাধ্যমে ইসরায়েল মসজিদ প্রাঙ্গণটি দখল করে নেয়। সেইসঙ্গে পূর্ব জেরুজালেমের বাকি অংশ এবং পশ্চিম তীরের নিকটবর্তী অঞ্চলগুলো নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়। এসব এলাকা তখন মিশর ও জর্ডানের নিয়ন্ত্রণে ছিল।

বর্তমানে আকসা কমপ্লেক্স ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও আল-আকসা পরিচালিত হয় জর্ডান-ফিলিস্তিনের একটি ওয়াকফ প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধানে। তবে এর প্রবেশপথগুলোতে থাকে দখলদার বাহিনী। এখন আল-আকসায় দুই রাকাত নামাজ পড়তেও প্রয়োজন হয় ইহুদি সেনাদের ছাড়পত্র। উল্লেখ্য, ফিলিস্তিন একটি আরব ভূমি এবং মুসলমানদের প্রাচীন ভূমি।

এখানে ইহুদিদের যে অধিকারের কথা বলা হয়, তার ঐতিহাসিক কোনো ভিত্তি নেই। কারণ ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দেড় হাজার বছর আগেই আরব মুসলমানরা এ অঞ্চল আবাদ করেছিল। ইহুদিবাদীদের দাবির ভিত্তি শুধু এতটুকুই যে, কয়েক হাজার বছর আগে খুবই স্বল্প কিছুকাল ফিলিস্তিনের ছোট্ট একটা অংশে তারা রাজত্ব করেছিল। সেটা এখন শুধুই ইতিহাসের গল্প, গত দুই হাজার বছরের ইতিহাসের সঙ্গে এ গল্পের কোনো যোগসূত্র নেই। সেই প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত ইহুদিদের এই ভূখণ্ডের সঙ্গে রাজনৈতিক সামাজিক-সাংস্কৃতিক কোনো ধরনের নেতৃত্ব সম্পর্ক ছিল না।

ঐতিহাসিক দলিল প্রমাণের আলোকে আল-আকসা ও জেরুজালেম সব ধরনের আইনের ভিত্তিতেই শুধু মুসলমানদের; অন্য কারও নয়। খোদ ধার্মিক ইহুদি শ্রেণির কাছেও বর্তমান ইসরায়েল রাষ্ট্র বৈধ নয়। তাওরাত ও তালমুদ অনুযায়ী তারা বিশ্বাস করে, পৃথিবীর শেষ সময় মাসিহ (দাজ্জাল) এসে তাদের জন্য শান্তির রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করবেন। এ কারণেই ধার্মিক ইহুদি সম্প্রদায় এখনো মূল মসজিদুল আকসা প্রাঙ্গণে প্রবেশ করে না, তারা শান্তির বাদশা আগমনের আগে সেখানে প্রবেশ করাকে পাপ মনে করে এবং এ কারণে তারা দেয়ালের বাইরের একাংশে উপাসনা করে।

পবিত্র জেরুজালেম নগরী কেন্দ্র করে মুসলমান-ইহুদি সংঘাতের জের ধরে ফিলিস্তিন দুই ভাগ হলেও ইসরায়েল স্বীকৃতি পেয়েছে, কিন্তু ফিলিস্তিন স্বীকৃতি পায়নি এখনো। ফিলিস্তিনের কোনো প্রধানমন্ত্রী নেই, বর্তমান ক্ষমতাসীন প্রধানকে বলা হয় ‘ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের প্রধানমন্ত্রী’। প্রস্তাবিত ফিলিস্তিন রাষ্ট্র ভৌগোলিকভাবে ইসরায়েল রাষ্ট্রের মাধ্যমে দুই ভাগে বিভক্ত ও বিচ্ছিন্ন। ভূমধ্যসাগরের তীরবর্তী বিচ্ছিন্ন গাজা উপত্যকা ভিন্ন কারণে মুসলমানদের আবেগে মিশে আছে। সুপ্রাচীনকাল থেকেই গাজা পৃথিবীর অন্যতম বাণিজ্য নগরী।

আরবিতে শব্দটির উচ্চারণ ‘গাজ্জাহ’, যার অর্থ ঐশ্বর্য ও প্রাচুর্য। নবী ইয়াকুব (আ.) অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেন এবং সেখান থেকে মিশরের মন্ত্রী পুত্র ইউসুফ (আ.)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। গাজা নগরীতে শহরে জন্মগ্রহণ করেন নবী সোলায়মান (আ.)। মহানবী হজরত মুহম্মদ (সা.)-এর জন্মের বহু আগে থেকেই মক্কার কুরাইশ সম্প্রদায় ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য দুটি বন্দরনগরীতে ভ্রমণ করত, যার বিবরণ রয়েছে পবিত্র কোরআনে।

সুরা কুরাইশে বলা হয়েছে, ‘কুরাইশ সম্প্রদায় যেহেতু অভ্যস্ত; যেহেতু তারা শীত ও গ্রীষ্মকালের (ইয়ামান ও শামে) ভ্রমণে অভ্যস্ত।’ (সুরা কুরাইশ : ১-২)। আয়াতের তাফসিরে বলা হয়, মক্কা ছিল অনুর্বর ভূমি, তাই মক্কার লোকজন বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল ছিল। আর মক্কার উত্তর ও দক্ষিণ দিকে ছিল দুটি সমুদ্রবন্দর ও বাণিজ্যনগরী। উত্তরে শাম অর্থাৎ গাজা উপত্যকার তীরবর্তী ভূমধ্যসাগর এবং দক্ষিণে ইয়েমেনের আদন সমুদ্রবন্দর ও বাণিজ্যনগরী।

আরবের প্রসিদ্ধ দুই প্রান্তের দুই বন্দরনগরী থেকে আফ্রিকা, ইউরোপ, হিন্দুস্তান, চীন প্রভৃতি দেশে বাণিজ্যিক জাহাজ আসা-যাওয়া করত। কুরাইশরা শীতকালে ভ্রমণ করত ইয়েমেনের আদন বন্দরে এবং গ্রীষ্মকালে ভ্রমণ করত শামের গাজা বন্দরে। নবীজিও শামদেশে বাণিজ্যিক কাফেলা নিয়ে ভ্রমণ করেছেন। আকসা ও গাজা তীরবর্তী অঞ্চলের বাণিজ্য পরিচালনা করেছেন।

নবীজির জন্মের আগে তার পিতামহ হাশিম ইবনে আব্দে মানাফ মক্কা থেকে কুরাইশদের একটি বাণিজ্যিক কাফেলা নিয়ে শামের গাজা উপত্যকায় ভ্রমণ করেন এবং সেখানেই তিনি ইন্তেকাল করেন। এখনো গাজা উপত্যকায় রয়েছে নবীজির পিতামহের কবর এবং তার নামে রয়েছে একটি মসজিদ। এই গাজা উপত্যকায় জন্মগ্রহণ করেছেন শাফেয়ি মাজহাবের পুরোধা ইমাম শাফেয়ি (রহ.)।

তার নামেও সেখানে রয়েছে একটি মসজিদ। শাম, ফিলিস্তিন, আকসা ও গাজা—এ পুণ্যভূমি আজ রক্তাক্ত ও বিধ্বস্ত। বিশ্বমানবতার প্রার্থনা—পবিত্র আল-আকসাকে ঘিরে আবার জেগে উঠবে নিরাপদ প্রাণের স্পন্দন। অসংখ্য নবী-রাসুলের পদধন্য এ ভূমি আবার আনন্দে হাসবে। মহান আল্লাহর কাছে আমরা এ দোয়া করি।

লেখক: মুহাদ্দিস ও ইসলামী চিন্তাবিদ