কালের দর্পনে আলীকদম ও আলীকদম কলেজ প্রতিষ্ঠায় পার্বত্যমন্ত্রীর উপানুষ্ঠানিক পত্র


Momtaj Uddin Ahamad প্রকাশের সময় : জুন ২৭, ২০২৪, ৫:৪৭ অপরাহ্ন /
কালের দর্পনে আলীকদম ও আলীকদম কলেজ প্রতিষ্ঠায় পার্বত্যমন্ত্রীর উপানুষ্ঠানিক পত্র

।। মমতাজ উদ্দিন আহমদ ।।

সবুজাভ অরণ্যঘেরা পাহাড়ি জেলা বান্দরবানের ‘আলীকদম’ এর নামকরণ ও ইতিহাস প্রসঙ্গ শুরু হয় ১৬৬১ খ্রিস্টাব্দের ৭ ফেব্রুয়ারি আরাকানে সস্ত্রীক শাহ সুজার হত্যাকাণ্ডের পর।

১৬৬১ খ্রিস্টাব্দের মাঝামাঝি সময় আরাকান বাহিনী ও মোঘল যোদ্ধাদের মধ্যে খন্ড খন্ড যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। এ যুদ্ধের কৌশল হিসেবে মোঘল বাহিনী রামু থেকে পাহাড়ি পথে তৎকালীন গহীন অরণ্য আলীকদমে ঢুকে পড়ার পর এ জনপদের নামকরণ ও ইতিহাসের সূচনা হয়। (অবশ্য আলীকদম নামকরণ প্রসঙ্গে ভিন্ন মতান্তরও রয়েছে। সে প্রসঙ্গ এখানে অপ্রাসঙ্গিক।)

পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল আইয়ুব খান একটি নতুন পদ্ধতির মাধ্যমে গণতন্ত্রকে তৃণমূল পর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে মৌলিক গণতন্ত্র অধ্যাদেশ ১৯৫৯ জারি করেন। পাঁচ স্তরবিশিষ্ট এ গণতন্ত্রে পল্লী এলাকায় নিম্নস্তরের মর্যাদা ছিলো ইউনিয়ন পরিষদ। এ ধারাবাহিকতায় পার্বত্য লামা-আলীকদম এলাকায় ‘গজালিয়া’ ও ‘আলীকদম’ ইউনিয়ন কাউন্সিল সৃষ্টি হয়।

আলীকদম ইউনিয়নের সীমারেখা ছিলো বর্তমান পুরো আলীকদম উপজেলাসহ, উত্তরে লামার গজালিয়া ইউনিয়ন এবং পশ্চিমে লামার ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়ন পর্যন্ত। তখন আলীকদম ইউনিয়নের সীমারেখা ছিলো বিশাল-বিস্তৃত। পরবর্তীতে ১৯৬৪ সালে আলীকদম থেকে বিভক্ত হয়ে লামা ইউনিয়নের যাত্রা শুরু হয়।

১৯৮২ সালের ৭ নভেম্বর তৎকালীন বাংলাদশ সরকার প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের পর ৮৮৫.৮৫ বর্গকিলোমিটার আয়তন নিয়ে আলীকদম থানা গঠিত হয়। প্রশাসনিক নিয়মে থানা থেকে উপজেলা সৃষ্টি হয়।

১৯৬০ এর দশকের ‘আলীকদম ইউনিয়ন পরিষদ’ গঠিত হওয়ার পর পার্বত্য এ জনপদে ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দে কয়েকটি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা লাভ করে। প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলি প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে এ জনপদে প্রাথমিক শিক্ষার সূচনা হয়।

স্বাধীনতা পরবর্তীকালে ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দে আলীকদম উচ্চ বিদ্যালয় এবং ১৯৭৮ খ্রিস্টাব্দে আলীকদম ইসলামিয়া মাদরাসা প্রতিষ্ঠা লাভ করেন দু’জন প্রাতঃস্মরণীয় মানুষ জনাব মুহাম্মদ আবু জাফর চৌধুরী ও মাওলানা আবুল কালাম আজাদ। তাঁদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন আরও কতিপয় সমাজতিহিতৈষী ব্যক্তিবর্গ।

মা-মাটির সাথে নাড়ির সম্পর্কিত পার্বত্যভূমি আলীকদমে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের শিক্ষার আলোকশিখার সূচনা যথাক্রমে ১৯৬৫, ১৯৭৬ ও ১৯৭৮ সালে জ্বলে উঠেছিল।

২০১৫ খ্রিস্টাব্দে স্থানীয় ৫ জন শিক্ষানুরাগী তরুন ও একজন শিক্ষিকার প্রচেষ্টায় উপজেলা সদরে ‘আলীকদম আইডিয়াল স্কুল এন্ড কলেজ’ এবং ২০১৮ খ্রিস্টাব্দে লামা–আলীকদম এলাকায় প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষার মানোন্নয়নের প্রয়াসে ‘আলীকদম ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ’ এর যাত্রা শুরু হয়। এ প্রতিষ্ঠানটি আলীকদমের শিক্ষাব্যবস্থায় একটি মাইলফলক হিসেবে প্রতিভাত হয়।
মাঝপথে আইডিয়াল স্কুলটি মাধ্যমিক পর্যায়ে থেমে গেলেও ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজ উচ্চ শিক্ষাক্ষেত্রে অবদান রাখতে সক্ষম হয়।

কিন্তু একটি উপজেলায় স্বতন্ত্র কলেজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্নটি ‘অমাবস্যার চাঁদ’ হয়ে অধরা থেকে যায় ‘অকাল কুষ্মাণ্ড’ ও ‘গোবর গণেশ’ নেতৃত্বের কারণে।

অবশেষে আলীকদমবাসীর শিক্ষাকাশে ‘একাদশে বৃহস্পতি’ শুরু হয় ২০২৩ খ্রিস্টাব্দে মে মাসে অনুষ্ঠিত এক সভায় তৎকালীন পাবর্ত্যমন্ত্রী জনাব বীর বাহাদুর উশৈসিং, এমপি’র বক্তৃতার অনল বাক্যবর্ষণে।

তিনি সেই বক্তব্যে বলেছিলেন, বান্দরবানের ৭টি উপজেলার মধ্যে শুধুমাত্র আলীকদম ছাড়া বাকী ৬ উপজেলায় কলেজ প্রতিষ্ঠা হয়েছে। জেলা সদরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হয়েছে। কিন্তু এ জনপদের নেতৃত্বের ব্যর্থতার কারণে কলেজ প্রতিষ্ঠা হচ্ছে না!

মন্ত্রী মহোদয়ের বক্তৃতায় প্রবল ঝাঁকুনি লাগে প্রশাসনিক ও স্থানীয় শিক্ষানুরাগী মহলে। শুরু হয় কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ।

অবশেষে আলীকদমবাসীর উচ্চ শিক্ষাকাশে আলোর ঝলকানি দেখা দেয়। আলীকদম থানা/উপজেলা সৃষ্টির ৪০ বছর ৮ মাস ৩ দিন পর ২০২৩ সালের ৭ জুলাই ‘আলীকদম কলেজ’ প্রতিষ্ঠাকল্পে একটি ‘সাংগঠনিক কমিটি’ গঠিত হয়।

১৯ সদস্যের কলেজ প্রতিষ্ঠার এই কমিটিতে আমি ‘সদস্য’ এবং জনসংযোগ উপ-কমিটির ‘আহ্বায়ক’ নিযুক্ত হই।

আমরা সফল হয়েছি। ইতোমধ্যে ৭টি দলিল মূলে ৭ একর ৮৪ শতাংশ (২২.৮৫ বিঘা) জমি কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য দানপত্রমূলে প্রাপ্ত হই। উপজেলা তারাবুনিয়া এলাকায় একই খন্ডের আওতাভূক্ত এ জমিতে আমরা সীমানা পিলার স্থাপন করেছি।

২০২৩ খ্রিস্টাব্দের ২৭ নভেম্বর ‘আলীকদম কলেজ’ এর নিজস্ব জমিতে সাইনবোর্ড তোলা হয়। এদিন নবমেঘগর্জনপুলকিত ময়ূরের মত আমাদের হৃদয় নৃত্য করেছিল!

আলীকদম উপজেলা সৃষ্টির ৪০ বছর ৮ মাস ৩দিন পর আমরা আলীকদম কলেজ’ নামী এই জয়বৃক্ষের জয়ধ্বজা স্থাপন করতে সক্ষম হই। আমরা স্বস্তিবোধ করছি।

আমরা থেকে যায়নি। তাই আমাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন বান্দরবান তথা পার্বত্য চট্টগ্রামের অবিসংবাদিত নেতা বীর বাহাদুর উশৈসিং, এমপি।

গত ৩১ নভেম্বর ২০২৩ খ্রিস্টাব্দে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী বীর বাহাদুর উশৈসিং, এমপি স্বাক্ষরিত ‘উপানুষ্ঠানিক পত্র’ দেন শিক্ষামন্ত্রীকে। পত্রে তিনি বলেন,

“প্রিয় মহোদয়
আমার আন্তরিক শুভেচ্ছা গ্রহণ করবেন।

আমার নির্বাচনী এলাকা ৩০০ নং বান্দরবান পার্বত্য জেলা ০৭টি উপজেলার সমন্বয়ে গঠিত। বান্দরবান পার্বত্য জেলা দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় অনগ্রসর ও পিছিয়ে পড়া একটি জেলা। আপনার সদয় অবগতির জন্য জানাচ্ছি যে, পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলা শিক্ষা ক্ষেত্রে এখনো বেশ অনগ্রসর। ভৌগালিক ভাবে দুর্গম ও অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে পার্বত্য তিন জেলায় মান সম্মত শিক্ষার প্রয়োজনীয় পরিবেশ গড়ে উঠেনি।

বান্দরবান জেলার আলীকদম উপজেলাটি ৪ টি ইউনিয়নের সমন্বয়ে গঠিত এবং প্রায় ৬৫ হাজার লোকের বসবাস। এ এলাকার যোগযোগ ব্যবস্থার প্রতিকূলতার পাশাপাশি স্থানীয় জনাসাধারণের আয়ের স্বল্পতার কারণে এসব এলাকার অসংখ্য ছাত্রছাত্রীর শিক্ষা জীবন মাধ্যমিক পর্যায়েই থেমে যায়। সামর্থ্যের অভাবে দরিদ্র পরিবারের সন্তানেরা এলাকার বাইরে গিয়ে কলেজে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পায়না। এ উপজেলা সৃষ্টির ৪১ বছর পরও আলীকদমবাসীর জন্য সার্বজনীন কোন কলেজ স্থাপন না হওয়া দুঃখজনক।

তবে কিছু শিক্ষানুরাগীর আন্তরিক প্রচেষ্টায় এই উপজেলায় একটি কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য জমি সংগ্রহ, তহবিল সংগ্রহ, এবং অস্থায়ী ক্যাম্পাস স্থাপন করে তাতে শিক্ষা কার্যক্রম চালুর জন্য উদ্যোগ গ্রহন করেছে। এ বিষয়টি ইতিমধ্যে উপজেলার কলেজ নির্মাণ কমিটি আমাকে অবগত করেছে।

বর্ণিত অবস্থায়, আলীকদম উপজেলায় একটি কলেজ ভবন নির্মাণপূর্বক শিক্ষা কার্যক্রম চালু করার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়ার জন্য আপনার আন্তরিক সহযোগিতা কামনা করছি।

শুভেচ্ছান্তে,
বীর বাহাদুর উশৈসিং, এমপি।”

আমরা মাননীয় এমপি’র অনুপ্রেরণা ও কলেজ নির্মাণের জন্য তাঁর ৫ কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণের ঘোষণা পেয়ে ধন্য হয়েছি। এ জনপদের শিক্ষাদারিদ্র্যকে এমন প্রবল তেজে জয়ী করার জন্য মহান সৃষ্টিকর্তা আমাদেরকে যে শক্তি দিয়েছেন তাঁর অন্যতম উসিলা হিসেবে প্রতিভাত হয়েছেন বান্দরবান জেলার মাননীয় এমপি মহোদয়।

আমরা এখন পুরোপুরি আশাবাদী। আগামী ৩০ জুলাই থেকে আলীকদম কলেজের একাডেমিক কার্যক্রম শুরু করতে পারবো। ছাত্র ভর্তি কার্যক্রম চলমান আছে। আলীকদম প্রেসক্লাবকে কলেজের অস্থায়ী কার্যালয় করে প্রশাসনিক কার্যক্রম জোরদার গতিতে চালানো হচ্ছে।

সেদিন বেশি দূরে নয়, যেদিন স্নিগ্ধ পবিত্র প্রভাতে ‘আলীকদম কলেজ’নামের এই বটবৃক্ষ ছায়াদান শুরু করবে! বিপুলচ্ছায়া এই বটবৃক্ষের তলে বসে আলীকদমসহ পার্শ্ববর্তী উপজেলার শিক্ষার্থীরা জগতের তাবৎ জ্ঞান আহরণ করবে! পাহাড়ের চূড়ায় পুণ্য সমীরণে এবং নির্মল সূর্য্যালোকের মধ্যে শিক্ষার্থীরা আলোরপ্রভায় আলোকিত হবে।

তখন স্বার্থক হবে আমাদের শ্রম। এমপি মহোদয়ে ডিও লেটার এবং একাডিমিক ভবন নির্মাণে ৫ কোটি টাকার প্রকল্প ঘোষণার পর পাহাড়ি উপজেলা আলীকদমের সমস্ত শূন্য প্রান্তর এবং উদার আকাশ তৃষিত বক্ষের ন্যায়, ব্যাকুল প্রসারিত বাহুর ন্যায় সেই দিনের জন্য অপেক্ষা করে আছে। আমার ক্ষুদ্র শক্তি অনুসারে আমিও সেইদিনের প্রতীক্ষায় প্রার্থনা করছি।

আমাদের জ্ঞানের অবকাশ, আমাদের ধ্যানের অবকাশ, আমাদের দারিদ্র্যের অবকাশ থেকে আর কে আমাদেরকে বঞ্চিত করবে? বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বকোণে অবস্থিত প্রিয় জন্মস্থান আলীকদমে যে পরমা মুক্তির অচলপ্রতিষ্ঠা হয়েছে, তাহা স্তব্ধ, তা নির্ব্বাক্, তা দীন, তা দিগম্বর, তা শাশ্বত! তাকে বলীর বাহু ও ক্ষমতাশালীর স্পর্দ্ধা স্পর্শ করতে পারেনি।

সকলেই ‘আলীকদম কলেজ’ প্রতিষ্ঠার বিরলভূষণ বিশালতার মধ্যে স্বেচ্ছায় সমর্পিত হয়ে আমাদেরকে ধন্য ও গুণমুগ্ধ করেছেন। সেদিন বেশী দূরে নয়। তখন জাগবে পুরো আলীকদমবাসীর মধ্যে আলোর দিশা!

যাঁরা দূর থেকে কাছ থেকে আলীকদম কলেজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্নসারথী হয়েছেন তাদের প্রতি রইলো অকৃত্রিম শ্রদ্ধা-ভালোবাসা। আর যাঁরা চণ্ডালীপণা আর নিষ্ঠুরতার কটাক্ষে আমাদেরকে আহত করেছেন তাদের উষ্মা, নিষ্ফল ধিক্কার আর অপকৌশল আজ নির্বাক-নিথর হয়ে তপোবনের দ্বারে আবর্জনার মত পড়ে রয়েছে।

অবশেষে দরাজকণ্ঠে উচ্চারণ করছি, ‘আলীকদম কলেজ’এর আশ্রমবৃক্ষ হতে শিরীষ পুষ্পের সুঘ্রাণ সবার জন্য উন্মুক্ত। আবারও জাতীয় কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায় বলি-
“এবার মহা-নিশার শেষে
আসবে ঊষা অরুণ হেসে
করুণ্ বেশে!
দিগম্বরের জটায় লুটায় শিশু-চাঁদের কর!
আলো তার ভরবে এবার ঘর।
তোরা সব জয়ধ্বনি কর!!”