
মমতাজ উদ্দিন আহমদ, আলীকদম (বান্দরবান):
পার্বত্য জেলা বান্দরবানের লামা ও আলীকদম উপজেলায় তীব্র বিদ্যুৎ সংকটে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ এক-চতুর্থাংশেরও নিচে নেমে আসায় দিন-রাত চলছে অসহনীয় লোডশেডিং। তীব্র গরমে একদিকে যেমন অতিষ্ঠ সাধারণ মানুষ, অন্যদিকে স্থবির হয়ে পড়েছে ব্যবসা-বাণিজ্য ও দাপ্তরিক কার্যক্রম। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর বিদ্যুৎ না থাকায় বিপাকে পড়েছে স্কুল-কলেজের কয়েক হাজার পরীক্ষার্থী।
সংকটের নেপথ্যে সঞ্চালন লাইনের জটিলতা:
লামা বিদ্যুৎ সরবরাহ দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, কক্সবাজারের ৩৩ কেভি সঞ্চালন লাইন এবং দোহাজারী গ্রিড থেকে প্রয়োজনীয় লোড বরাদ্দ না পাওয়ায় এই সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানে লামা, আলীকদম ও বমু বিলছড়ি উপজেলায় মোট বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ৬.৫ থেকে ৬.৮ মেগাওয়াট। কিন্তু চকরিয়া কেন্দ্র থেকে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ১ থেকে ১.৫ মেগাওয়াট। বিপুল এই ঘাটতির কারণে বিদ্যুৎ বিভাগ বাধ্য হয়ে পর্যায়ক্রমে লোডশেডিং দিচ্ছে।

বিপর্যস্ত জনজীবন ও শিক্ষা কার্যক্রম:
দীর্ঘদিন ধরে চলা এই লোডশেডিংয়ের প্রভাব পড়েছে সব শ্রেণিপেশার মানুষের ওপর। আলীকদম সদরের গৃহিণী নয়নদেবী তঞ্চঙ্গ্যা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “সন্ধ্যা হলেই বিদ্যুৎ চলে যায়। রান্নাবান্না আর ছেলেমেয়েদের পড়াশোনায় দারুণ অসুবিধা হচ্ছে।” সামনে প্রথম সাময়িক ও বৃত্তি পরীক্ষা থাকায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা। বায়েজিদ রহমান শিহাব নামের এক শিক্ষার্থী জানায়, সন্ধ্যার পর পড়ার টেবিলে বসলেই বিদ্যুৎ চলে যায়, যা তাদের প্রস্তুতির ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে।
অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক এনএম মঞ্জুরুল ইসলাম চৌধুরী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছেন, “রমজানের পর থেকে লোডশেডিং এত বেড়েছে যে ফ্রিজে রাখা মাছ-মাংস নষ্ট হচ্ছে। শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ মানুষ গরমে ছটফট করছে কিন্তু ফ্যান চালানোর সুযোগ নেই।”
ব্যবসায়িক ও দাপ্তরিক স্থবিরতা:
বিদ্যুৎ না থাকায় ছোট-বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ও উৎপাদনমুখী কলকারখানা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। আলীকদম বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সদস্য নাছির উদ্দিন জানান, সন্ধ্যার পর জেনারেটর জ্বালিয়ে ব্যবসা করতে হচ্ছে, এতে জ্বালানি বাবদ অতিরিক্ত খরচ গুনতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। এছাড়া সরকারি-বেসরকারি অফিসগুলোতে কম্পিউটারাইজড কাজ ব্যাহত হওয়ায় সাধারণ মানুষ কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য:
বিদ্যুৎ সংকটের কথা স্বীকার করে লামা বিদ্যুৎ বিভাগের আবাসিক প্রকৌশলী গৌতম চৌধুরী বলেন, “আমরা চকরিয়া থেকে বিদ্যুৎ পাই। চকরিয়া বরাদ্দ পায় কক্সবাজার থেকে আর তারা পায় দোহাজারী গ্রিড থেকে। চাহিদার তুলনায় আমাদের বরাদ্দ অত্যন্ত নগণ্য। সীমিত বরাদ্দ দিয়ে সব লাইন চালু রাখা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।”
এদিকে কক্সবাজার বিদ্যুৎ বিতরণ বিভাগের সহকারী প্রকৌশলী দীপ্ত বড়ুয়া জানান, কক্সবাজারে ১৪০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে বর্তমানে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৯০ মেগাওয়াট। তিনি দাবি করেন, বরাদ্দ প্রাপ্তির বিষয়ে স্থানীয় অফিসের কোনো হাত নেই এবং পুরো দেশের চিত্রই প্রায় একই রকম। তবে চকরিয়া কেন্দ্রের সাথে সমন্বয় করে বরাদ্দ বাড়ানোর পরামর্শ দেন তিনি।
স্থানীয় গ্রাহকদের দাবি, দ্রুত এই বিদ্যুৎ সংকটের সমাধান না হলে জনভোগান্তি চরম আকার ধারণ করবে। তারা দোহাজারী ও কক্সবাজার গ্রিড থেকে লামা-আলীকদমের জন্য ন্যুনতম প্রয়োজনীয় লোড বরাদ্দের জোর দাবি জানিয়েছেন।
আপনার মতামত লিখুন :