
মমতাজ উদ্দিন আহমদ, আলীকদম (বান্দরবান)
পোয়ামুহুরী বাজারঘাট থেকে আমাদের নৌকাটি যখন স্রোতের বিপরীতে এগোতে শুরু করল, তখন মনে হলো—আমরা কেবল একটি নদীর উজানে যাচ্ছি না, যাচ্ছি নিজের শেকড়ের দিকেও। লক্ষ্য একটাই—মাতামুহুরী নদীর উৎসমুখ দেখা। প্রায় এক যুগ পর আবার এই উজানমুখী যাত্রা। নদীর বুকেই যার শৈশব, তার কাছে এ যাত্রা নিছক ভ্রমণ নয়—এ এক ফিরে দেখা।
মাতামুহুরী—নামেই মায়ের স্নেহ। এই নদীর কোলে আমার জন্ম, তার স্রোতেই কেটেছে শৈশব-কৈশোরের উন্মাদনা। আমার মতো অসংখ্য মানুষের স্মৃতি, আনন্দ ও বেদনা এই নদীর সঙ্গে জড়িয়ে আছে। কখনো সে লাস্যময়ী, কখনো রহস্যময়ী; কখনো হাস্যময়ী, কখনো গম্ভীর। বাংলাদেশ–মায়ানমার সীমান্তবর্তী পাহাড় থেকে উৎপন্ন হয়ে বঙ্গোপসাগরে মিলিয়ে যাওয়া এই নদীর চলন যেন এক অপরূপা নারীর আঁকাবাঁকা পদচারণা।
অনন্তকালের অভিযাত্রায় মাতামুহুরী এখানকার প্রকৃতি, ভূসম্পদ ও জনজীবনের প্রাণকেন্দ্র। তাই জীবনের এই মধ্যগগণে দাঁড়িয়ে আবারও ইচ্ছে জেগেছিল—একবার ছুঁয়ে দেখা তার জন্মস্থল।
প্রস্তুতির গল্প, পথের গল্প:
ঈদের পরদিন আলীকদম প্রেসক্লাবে জমায়েত হলো আমাদের ছোট্ট ভ্রমণদল। চাঁদের গাড়িতে পাহাড় কেটে বানানো আলীকদম–পোয়ামুহুরী সড়ক ধরে শুরু হলো যাত্রা। পাহাড়ের পর পাহাড় ছুঁয়ে চলা এই পথ যেমন মন ভরায়, তেমনি চোখে আঙুল দিয়ে দেখায়—উন্নয়ন আর অবহেলার সহাবস্থান।
খেদারঝিরি থেকে নদীপথ ধরে হাঁটাপথে পৌঁছালাম পোয়ামুহুরী বাজারে। সন্ধ্যার আগেই গেলাম রূপমুহুরী ঝর্ণায়। বর্ষাকাল অথচ ঝর্ণার পানি ক্ষীণ—দেখে বুকটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠল। পাহাড়ের ওপর নির্বিচারে গাছ কাটা আর জুমচাষের ক্ষত এখানে স্পষ্ট।

রাতের নদী, সকালের যাত্রা:
সন্ধ্যায় মাতামুহুরীতে জাল ফেলে ধরা মাছেই তৈরি হলো রাতের খাবার। পাহাড়ি রাতের নিস্তব্ধতায় ঘুম ভাঙল ভোরে। সকাল আটটার আগেই শুরু হলো মূল অভিযান—মাতামুহুরীর উৎসমুখের পথে।
দু’টি ইঞ্জিনচালিত নৌকা নিয়ে উজানে যাত্রা। বর্ষা হলেও নদীর পানি কম। মাঝেমধ্যেই চরে আটকে যাচ্ছে নৌকা—নামতে হচ্ছে, ঠেলতে হচ্ছে। যত উজানে যাচ্ছি, ততই প্রকৃতি যেন গম্ভীর হয়ে উঠছে। গাছ বড় হচ্ছে, পাহাড় উঁচু হচ্ছে, আর নদী কখনো কোমর পানি, কখনো গোড়ালিতে নেমে আসছে।
একসময় চোখে পড়ল ইন্দুখাল, সিন্দুখাল, মরণী খাল, তরণী খাল—সবাই যেন রাজপুত্রের মতো এসে মিশেছে মাতামুহুরীর বুকে। একসময় এই খালগুলোর প্রাণপ্রবাহেই ছিল নদীর যৌবন। আজ সে যৌবন ক্লান্ত।
প্রকৃতির ক্ষয়, স্মৃতির ক্ষত:
২০১২ সালের যাত্রার কথা মনে পড়ল। তখন নদীর পাড়ে পাখির উড়াউড়ি ছিল নিত্যসঙ্গী। নদী টিটি, মেঘ হও মাছরাঙা—সবই ছিল চোখের সামনে। এবার সেই পাখিরা নেই। বানরের একটি ক্ষণিক বিরক্ত উপস্থিতিই ছিল একমাত্র বন্যপ্রাণীর দেখা। এই নীরবতা কেবল প্রকৃতির নয়, আমাদের দায়হীনতারও।
মাছখুম থেকে পাহাড়ভাঙ্গা:
পথে এসে পৌঁছালাম কিংবদন্তিতুল্য মাছখুমে। সবুজাভ-নীল গভীর জল, দু’পাশে পাহাড়ের ছায়া—এখানেই মাতামুহুরী এখনো নিজের আভিজাত্য ধরে রেখেছে। সেই শীতল জলে ঝাঁপিয়ে পড়া ছিল যেন দীর্ঘ পথচলার ক্লান্তি ধুয়ে ফেলা।
এরপর হাঁটা। নদীপথ ছেড়ে ঝোপঝাড় ডিঙিয়ে পৌঁছালাম পাহাড়ভাঙ্গা মুরুং পাড়ায়। প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানে থাকা এই মানুষগুলো আধুনিকতার বাহুল্য ছাড়াই সুখী। শিশুদের নগ্ন হাসি, নদীতে সাঁতার—সব মিলিয়ে এক ভিন্ন জগৎ।
যেখানে নদীর জন্ম:
অবশেষে পৌঁছালাম সেই কাঙ্ক্ষিত স্থানে। পাহাড়ের বুক চিরে দুই ছড়া—দোছরি আর ফাত্তারা—একত্র হয়েছে ইংরেজি ‘Y’ আকৃতিতে। এখান থেকেই জন্ম নিয়েছে মাতামুহুরী। দোছরির পানি উষ্ণ, ফাত্তারার জল কনকনে ঠান্ডা। ফাত্তারার শীতল জলে বসে মনে হলো—এ যেন নদীর প্রথম নিঃশ্বাস।
সব দ্বিধা, ক্লান্তি আর অপূর্ণতা পেছনে ফেলে প্রকৃতির এই আদিম সৌন্দর্যের সামনে দাঁড়িয়ে শুধু একটাই অনুভূতি জাগল—মাতামুহুরী কেবল একটি নদী নয়, সে আমাদের স্মৃতি, আমাদের দায়।
শেষকথা:
এই ভ্রমণ আনন্দের, ইতিহাসের, আবার বেদনারও। মাতামুহুরী আজো বয়ে চলে, কিন্তু তার প্রাণ ক্লান্ত। নদী ও প্রকৃতি আমাদের সম্পদ—এই সত্যটি যদি আমরা ভুলে যাই, তবে একদিন কেবল গল্পেই বেঁচে থাকবে মাতামুহুরী।
আসুন, ভ্রমণ করি দায়িত্ব নিয়ে। নিজে বাঁচি, নদীকেও বাঁচাই।
আপনার মতামত লিখুন :