পারিবারিক প্রতিহিংসার বিষবাষ্প: এক পক্ষাঘাতগ্রস্ত মা ও মানবিকতার মৃত্যু


Momtaj Uddin Ahamad প্রকাশের সময় : ফেব্রুয়ারী ১৫, ২০২৬, ৬:৩৮ অপরাহ্ন /
পারিবারিক প্রতিহিংসার বিষবাষ্প: এক পক্ষাঘাতগ্রস্ত মা ও মানবিকতার মৃত্যু

বিশেষ সম্পাদকীয়:

বান্দরবানের আলীকদমে পক্ষাঘাতগ্রস্ত এক বৃদ্ধা মায়ের গলাকাটা নিথর দেহ উদ্ধারের খবরটি যখন প্রথম কানে আসে, তখন জনমনে কেবল আতঙ্ক আর উদ্বেগ ছড়িয়েছিল। কিন্তু ঘটনার ২৪ ঘণ্টার মাথায় যখন জানা গেল, জন্মদাত্রী সমতুল্য সেই শাশুড়িকে তাঁর নিজ পুত্রবধূই চরম নৃশংসতায় জবাই করেছেন—তখন সমাজ হিসেবে আমাদের মাথা নত হয়ে আসে। আলীকদমের এই হত্যাকাণ্ড একটি অপরাধ নয়, এটি আমাদের পারিবারিক কাঠামোর চরম অবক্ষয় এবং মানবিক মূল্যবোধের দেউলিয়াত্বের এক বীভৎস দলিল।

নিহত রহিমা বেগম ছিলেন একজন অসহায়, শয্যাশায়ী নারী। দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে তিনি ছিলেন পরনির্ভরশীল। যে মা কথা বলতে পারতেন না, নিজে নড়াচড়া করতে পারতেন না, এমনকি কোনো অন্যায়ের প্রতিবাদ করার শক্তিও যাঁর ছিল না—তাঁকে হত্যার অস্ত্র হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে কেবল এক পৈশাচিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য।

তদন্তে উঠে এসেছে, ঘাতক পুত্রবধূ ইয়াসমিন আক্তার রেশমি তাঁর স্বামী ও সতিনকে হত্যা মামলায় ফাঁসানোর জন্য এই পথ বেছে নেন। পারিবারিক কলহ, বহুবিবাহ এবং নির্যাতনের শিকার হয়ে একজন মানুষের মনে কতটা বিষ জমলে তিনি এমন ঠান্ডা মাথার খুনি হয়ে উঠতে পারেন, তা ভাবলে শিউরে উঠতে হয়। এখানে অপরাধী কেবল সেই পুত্রবধূ নন, বরং সেই পরিবেশটিও কি দায়ী নয় যেখানে প্রতিহিংসা মেটাতে একজন অসহায় মানুষকে ‘বলির পাঁঠা’ বানানো হয়?

বিগত কয়েক বছরে আমাদের দেশে পারিবারিক কলহের জেরে নিজ আপনজনকে হত্যার প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। স্বামী-স্ত্রীর দ্বন্দ্বে সন্তান বা বৃদ্ধ বাবা-মাকে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। আলীকদমের এই ঘটনায় দেখা যাচ্ছে, ঘাতক রেশমি নিজেই ৯৯৯-এ ফোন করে নাটক সাজিয়েছিলেন। এই শীতল মস্তিষ্ক এবং সুপরিকল্পিত অপরাধ প্রমাণ করে যে, অপরাধীর মনে আইনের প্রতি কোনো ভয় বা নৈতিকতার বিন্দুমাত্র বালাই নেই।

তবে মনে রাখতে হবে, যেকোনো পারিবারিক কলহ বা নির্যাতনের বিচার চাওয়ার আইনগত পথ খোলা ছিল। রেশমি আগেও আদালতের আশ্রয় নিয়েছিলেন। কিন্তু আইনি পথে না হেঁটে তিনি যে পথ বেছে নিলেন, তা কোনোভাবেই ক্ষমার যোগ্য নয়। একজন পক্ষাঘাতগ্রস্ত বৃদ্ধা, যিনি তাঁর জীবনের শেষ সময়টুকুতে পরিবারের মমতা পাওয়ার হকদার ছিলেন, তাঁকে এমন নৃশংস মৃত্যুবরণ করতে হলো—এর চেয়ে বড় সামাজিক লজ্জা আর কী হতে পারে?

আমরা আলীকদম থানা পুলিশের দ্রুত রহস্য উদ্ঘাটন প্রক্রিয়ার প্রশংসা করি। তবে কেবল দ্রুত তদন্তই যথেষ্ট নয়; এই ধরণের লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের বিচার হতে হবে দ্রুততম সময়ে। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিই কেবল সমাজকে এই বার্তা দিতে পারে যে, পারিবারিক প্রতিহিংসার জেরে কোনো নিরপরাধ বা অসহায় মানুষের রক্ত ঝরানো হলে পার পাওয়া অসম্ভব।

একই সাথে আমাদের ভাবা প্রয়োজন, কেন আমাদের পারিবারিক বন্ধনগুলো এতোটা ভঙ্গুর হয়ে পড়ছে? কেন শ্রদ্ধাবোধের জায়গা দখল করছে ঘৃণা আর প্রতিহিংসা? ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার অভাব এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি আমাদের ঘরগুলোকে আজ অনিরাপদ করে তুলছে।

রহিমা বেগমের এই রক্তমাখা বিয়োগান্তক বিদায় আমাদের সমাজের বিবেককে এক বড় প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিল। আমরা কি মানুষ হিসেবে বেঁচে আছি, নাকি প্রতিহিংসার আগুনে পুড়ে সবাই একেকজন ছদ্মবেশী দানবে পরিণত হচ্ছি? উত্তরটি আমাদের প্রত্যেকের ভেতরই খুঁজতে হবে।