মাতামুহুরী: পাহাড়ের আঁচলে জড়ানো এক মায়ের নদী


Momtaj Uddin Ahamad প্রকাশের সময় : নভেম্বর ১০, ২০২৫, ৫:৪২ পূর্বাহ্ন /
মাতামুহুরী: পাহাড়ের আঁচলে জড়ানো এক মায়ের নদী

।। মমতাজ উদ্দিন আহমদ ।।

দুই পাশে পাহাড়, যেন প্রেয়সীর মৃদু হেলান—তার বুকে সবুজ আঁচল মেলে আছে দূর থেকে দূরান্ত পর্যন্ত। আর মাঝখান দিয়ে কুয়াশা মিশ্রিত বাতাসে ঘোলা জলের ধারা গুনগুন করে ছুটে চলে পাহাড় থেকে পাহাড়ের দ্বারে। সে যেন কোনো নিঃশব্দ সুর, যার ছন্দে ঘুমিয়ে থাকে প্রকৃতির হৃদয়। এই স্রোতধারার নাম মাতামুহুরী—দেশের পূর্ব পাহাড়ি অঞ্চলের প্রাণ, বান্দরবান আর কক্সবাজারের জনজীবনের ধুকপুকানি।

মাতামুহুরী শুধু একটি নদী নয়—এ যেন পাহাড়ি মানুষের জীবনের অংশ, তাদের ভালোবাসা, প্রার্থনা আর প্রজন্মের কাব্য। এই নদীর তীরে গড়া ঘর, এই নদীর জলে ধোয়া মুখ, আর এই নদীর স্রোতে মিশে থাকা শত শত গল্প—কখনো আনন্দের, কখনো বেদনার। পাহাড়ি বানের বেগে যখন ঘর-বাড়ি ভেসে যায়, স্বজন হারায়, তখনও মানুষ আশ্রয় খোঁজে এই নদীর বুকেই। কারণ, ‘মাতা’ শব্দের মতোই মাতামুহুরী তাদের কাছে এক স্নেহময়ী মা—যে বুকে আগলে রাখে দুই পারে বসবাস করা সন্তানদের।

কিন্তু আজ সেই মায়ের বুকেই গভীর ক্ষত। নদীর তীরে তামাক চাষের বিষমাখা ধোঁয়া, অযাচিত ইউরিয়া আর কীটনাশকের ছোবলে হারিয়ে যাচ্ছে নদীর প্রাণ-বৈচিত্র্য। প্রতিবছর রবিশষ্য মৌসুমে নদীর চরাঞ্চলে শুরু হয় ক্ষতিকর তামাক চাষ, বিস্তার লাভ করে নদীর বুকেও। পাশাপাশি পাহাড়ের জুমচাষ ও রাস্তা তৈরির মাটি ঢুকে যাচ্ছে নদীর গর্ভে। ধীরে ধীরে বিলীন হচ্ছে নদীর নাব্যতা, ম্লান হচ্ছে তার নির্মল সুর। যে নদী একদিন জীবন দিত, আজ নিজেই নিঃশ্বাস নিচ্ছে কষ্টে।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য বলছে, ১৪৬ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য ও ১৫৪ মিটার গড় প্রস্থের সর্পিলাকার এই নদীটির উৎস বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার সীমান্তঘেঁষা পাহাড়ে। মারমা ভাষায় নদীটির নাম ‘মোরেই খ্যোং’—যার অর্থই মাতামুহুরী নদী।

এ প্রতিবেদক সরেজমিনে অনুসন্ধান করে দেখেছেন, নদীর উৎপত্তি আলীকদম উপজেলার বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তবর্তী দোছড়ি-ফাত্তারা এলাকায়। দুটি খাল—দোছড়ি ও ফাত্তারা—ইংরেজি ‘Y’ অক্ষরের মতো সংযুক্ত হয়ে গঠন করেছে মাতামুহুরীর জন্মস্থান। এখানকার পাহাড়ভাঙা নামে মুরুং পাড়ার গল্পও এক সময়কার পাহাড়ধসের সাক্ষ্য বহন করে।

আরও একটি জনশ্রুতি বলে, এই নদী কোনো একক উৎস থেকে জন্ম নেয়নি। বরং মাতৃস্তন সদৃশ পাহাড়ের গা থেকে চুয়ে চুয়ে পড়া অসংখ্য জলধারার মিলনে তৈরি হয়েছে মাতামুহুরী। তাই তার নাম—‘মাতা’ অর্থে মা, আর ‘মুহুরী’ অর্থে অসংখ্য ছিদ্র দিয়ে ঝরেপড়া জল।

মাতামুহুরী নদী তাই শুধু ভূগোলের অংশ নয়, সে এক দার্শনিক রূপক—এক মায়ের রূপ, যে সন্তানদের সুখে-দুঃখে ছায়া হয়ে থাকে, অথচ আজ নিজেই কষ্টে নীরব। সময় এসেছে আবার তার বুক থেকে সেই দুঃখের পরত সরিয়ে দেওয়ার, যেন সে আবার ফিরে পায় নিজের স্রোত, নিজের সুর, নিজের মাতৃত্বের কোমল দীপ্তি।

এ নদীকে বাঁচানো মানে শুধু একখণ্ড জলরেখাকে টিকিয়ে রাখা নয়—এ মানে একটি অঞ্চলের সংস্কৃতি, স্মৃতি, মানবিকতা ও ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখা। কারণ মাতামুহুরী মানে—মায়ের জল। আর মায়ের জল কখনো শুকিয়ে যেতে দেওয়া যায় না।