রক্তে কেনা ভূখণ্ডে উন্মাদের মানচিত্র: সার্বভৌমত্বের প্রতি বালখিল্য আস্ফালন


Momtaj Uddin Ahamad প্রকাশের সময় : নভেম্বর ১১, ২০২৫, ৪:৪৪ অপরাহ্ন /
রক্তে কেনা ভূখণ্ডে উন্মাদের মানচিত্র: সার্বভৌমত্বের প্রতি বালখিল্য আস্ফালন

।। মমতাজ উদ্দিন আহমদ ।।


ত্রিপুরা রাজ্যের একদা রাজবংশের উত্তরাধিকারী ও তিপ্রা মোথা পার্টির প্রধান, প্রদ্যুৎ বিক্রম মানিক্য দেববর্মা। তিনি স্থানীয়ভাবে ‘বুবাগ্রা’ নামে পরিচিত। ১১ নভেম্বর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যে কল্পিত ‘গ্রেটার ত্রিপুরা ল্যান্ড’-এর মানচিত্র তিনি প্রকাশ করেছেন, তা কেবল উন্মত্ত আচরণ বা বালখিল্যতার নামান্তর নয়, বরং এটি একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে গুরুতর উস্কানি। কুমিল্লা ও চট্টগ্রাম বিভাগের ১১টি জেলাকে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের সাথে একীভূত করার এই দাবি, চট্টগ্রাম বন্দর দখলের আস্ফালন এবং আইএসআই সংক্রান্ত ভিত্তিহীন অভিযোগ—সবকিছুই প্রমাণ করে যে, এটি এক ভ্রান্ত এবং বিপজ্জনক খেয়াল, যা কলমের খোঁচায় নয়, বরং রক্তভেজা ইতিহাসের বাস্তবতায় চূর্ণ হওয়া অনিবার্য।

মানচিত্রের রাজনীতি ও সার্বভৌমত্বের পবিত্রতা:

একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের মানচিত্র তার সার্বভৌমত্বের পবিত্র প্রতীক। বাংলাদেশের মানচিত্রের প্রতিটি রেখা রক্তের বিনিময়ে আঁকা, প্রতিটি ইঞ্চি মাটি হাজারো শহীদের আত্মত্যাগের ফসল। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ তার স্বাধীনতা অর্জন করেছিল কোনো রাজ্যের করুণায় নয়, বরং দীর্ঘ নয় মাসব্যাপী রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম ও আত্মদানের মধ্য দিয়ে।

প্রদ্যুৎ বিক্রম মানিক্য দেববর্মা কুমিল্লা, চাঁদপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফেনী এবং বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের সাতটি জেলা—চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান, কক্সবাজার—অর্থাৎ পুরো গ্রেটার চট্টগ্রাম বিভাগকে নিয়ে যে ‘গ্রেটার ত্রিপুরা ল্যান্ড’-এর স্বপ্ন দেখছেন, তা ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা, আন্তর্জাতিক আইন এবং বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রতি এক চরম অবজ্ঞা। এই ভূখণ্ড কোনো রাজার ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয় যে তিনি তা ফেসবুকে দাবি করবেন। এই অঞ্চলের জনগণ সার্বভৌম বাংলাদেশের নাগরিক এবং তাদের ভাগ্য বাংলাদেশের সংবিধান দ্বারা নির্ধারিত।

তাঁর এই দাবি, যেখানে তিনি চট্টগ্রাম বন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক লাইফলাইনকে “২ মিনিটের মধ্যে দখল” করার ঔদ্ধত্য দেখান, তা কেবল কূটনৈতিক শিষ্টাচারের লঙ্ঘনই নয়, এটি একটি সন্ত্রাসী মানসিকতার প্রতিচ্ছবি যা বাংলাদেশের শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি স্বরূপ।

উপজাতীয় সৌহার্দ্য নাকি উস্কানির চাল?

বুবাগ্রা দাবি করেছেন যে, পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় জনগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ও নৃতাত্ত্বিকভাবে তাদের কাছের এবং তারা তাঁকে পার্বত্য চট্টগ্রাম দখল করে ‘গ্রেটার ত্রিপুরা ল্যান্ড’ প্রতিষ্ঠার জন্য অনুরোধ করছেন। এই বক্তব্য অত্যন্ত বিপজ্জনক, বিভেদসৃষ্টিকারী এবং ভিত্তিহীন

১. সাংস্কৃতিক নৈকট্য: সংস্কৃতি ও নৃতাত্ত্বিক নৈকট্য একটি জাতি বা অঞ্চলের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে কোনোভাবেই প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে না। বাংলাদেশের বাঙালি ও পাহাড়ি সব জনগোষ্ঠীই তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও স্বাধীন পরিচিতি নিয়ে বাংলাদেশে বসবাস করে। তারা বাংলাদেশের সংবিধানের প্রতি অনুগত।

২. ঐতিহাসিক বাস্তবতা: পার্বত্য চট্টগ্রামসহ গোটা চট্টগ্রাম অঞ্চল বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ভূখণ্ড। এই অঞ্চলের কোনো জনগোষ্ঠী যদি তাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল না হয়, তবে সেটা তাদের ব্যক্তিগত উস্কানি হতে পারে—কিন্তু একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে অন্য একটি রাষ্ট্রের কোনো নেতার এমন দাবি সম্পূর্ণভাবে অগ্রহণযোগ্য, উন্মাষিক ও ভ্রান্ত।

ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও উস্কানির কূটচাল:

এটি অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় যে, ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের রাজা কিংবা মুখ্যমন্ত্রীরা মাঝে মাঝে বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব নিয়ে এমনসব বালখিল্যতাপূর্ণ বক্তব্য দিয়ে থাকেন। তাদের এই আচরণকে কেবল ব্যক্তিবিশেষের আবেগ বা ইচ্ছাপূরণ হিসেবে দেখা চলে না; বরং একে রাজনৈতিক উস্কানি এবং আঞ্চলিক অস্থিরতা সৃষ্টির কূটচাল হিসেবেই প্রতিভাত করা উচিত।

প্রদ্যুৎ বিক্রম মানিক্য দেববর্মা যখন দিল্লি বিস্ফোরণ এবং আইএসআই-এর উপস্থিতি নিয়ে ভিত্তিহীন দাবি করেন এবং এরপরই তাঁর কল্পিত মানচিত্র প্রকাশ করেন, তখন এর পেছনে থাকা উস্কানিমূলক উদ্দেশ্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। রাজনীতিকে জাতীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে রাখার যে পরামর্শ তিনি দেন, তা প্রথমে তাঁর নিজের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হওয়া উচিত—অর্থাৎ, তাঁকে তার খামখেয়ালি রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা চরিতার্থ করতে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা নষ্ট করার চেষ্টা থেকে বিরত থাকতে হবে।

ভ্রষ্ট ধারণা ও কলমের খোঁচায় প্রত্যাখ্যান:

জনাব দেববর্মার ধারণাটি একটি ভ্রষ্ট চিন্তার ফসল, যা বাংলাদেশের রক্তভেজা মাটির বাস্তবতা বোঝে না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারিত মানচিত্রের মাধ্যমে তাঁর এই কাল্পনিক মানচিত্র বাস্তবে কোনো প্রভাব ফেলবে না। কারণ—

  • শক্তিশালী প্রতিরোধ: বাংলাদেশের সরকার, সামরিক বাহিনী এবং ১৮ কোটি জনগণের সার্বভৌমত্বের প্রতি অনড় অবস্থান তাঁর এই ইচ্ছাকে চূর্ণ করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
  • আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি: বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। কোনো ব্যক্তিবিশেষের ফেসবুক পোস্ট বা রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের দাবি আন্তর্জাতিক সীমানাকে পরিবর্তন করতে পারে না।

তাঁর উচিত হবে বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের ক্ষমতায়ন বা নিরাপত্তার বিষয়ে উপদেশ দেওয়ার আগে নিজ রাজ্যের এবং নিজের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা পূরণের পথকে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপমুক্ত রাখা।

ত্রিপুরা রাজা প্রদ্যুৎ বিক্রম মানিক্য দেববর্মা কর্তৃক বাংলাদেশের ভূখণ্ড নিয়ে কাল্পনিক ‘গ্রেটার ত্রিপুরা ল্যান্ড’-এর মানচিত্র প্রকাশ এবং চট্টগ্রাম বন্দর দখলের আস্ফালনের মতো উস্কানিমূলক বক্তব্যের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সরকারের কূটনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানানো অবশ্যই উচিত। এটি কেবল ব্যক্তির উন্মত্ত আচরণের বিষয় নয়, বরং এর পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য এবং আঞ্চলিক অস্থিরতা সৃষ্টির সুস্পষ্ট উস্কানি নিহিত। এই ধরনের কর্মকাণ্ড একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্য মারাত্মক অবমাননাকর এবং আন্তর্জাতিক আইনে সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। বাংলাদেশ সরকারের উচিত হবে: প্রথমত, ঢাকাস্থ ভারতীয় হাইকমিশনারকে তলব করে বা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে কূটনৈতিক নোট (Note Verbale) পাঠিয়ে এই উস্কানিমূলক বক্তব্যের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানানো। দ্বিতীয়ত, ভবিষ্যতে যেন কোনো ভারতীয় রাজনৈতিক নেতা বা ব্যক্তিত্ব বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতা নিয়ে এমন বালখিল্যতাপূর্ণ ও ভিত্তিহীন মন্তব্য করতে না পারে, সে জন্য ভারত সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ লিপি পাঠানো। এই ধরনের নীরবতা ভবিষ্যতে এই ধরনের অযৌক্তিক দাবিকে আরও উৎসাহিত করতে পারে। তাই, শক্ত ও স্পষ্ট ভাষায় প্রতিবাদ জানিয়ে এই ভ্রান্ত ধারণাকে শুরুতেই কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করা এবং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি অটল অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করা অপরিহার্য।

পরিশেষে বলতে চাই, গ্রেটার ত্রিপুরা ল্যান্ড-এর দাবি একটি উন্মাদের প্রলাপ ব্যতীত অন্য কিছু নয়। বাংলাদেশ তার স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়। পাহাড় ও সমতলের সমস্ত ভূখণ্ড আমাদের রক্তে কেনা সম্পদ। এই ভূখণ্ড নিয়ে কোনো ধরনের বালখিল্যতাপূর্ণ আস্ফালন বা উস্কানি বরদাশত করা হবে না। প্রদ্যুৎ বিক্রম মানিক্য দেববর্মাসহ সংশ্লিষ্ট সকলের মনে রাখা উচিত, স্বাধীন বাংলাদেশের সীমানা অত্যন্ত মজবুত এবং এই সীমানার পবিত্রতা রক্ষার জন্য বাঙালি জাতি সর্বদা প্রস্তুত।

লেখক: সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান পার্বত্য জেলা।