আলীকদমের পর্যটন: অব্যবস্থাপনা ও অনিয়ন্ত্রিত অনলাইন গ্রুপের লাগাম টানার সময় এখন


Momtaj Uddin Ahamad প্রকাশের সময় : জুন ১৫, ২০২৫, ১২:৩৬ অপরাহ্ন /
আলীকদমের পর্যটন: অব্যবস্থাপনা ও অনিয়ন্ত্রিত অনলাইন গ্রুপের লাগাম টানার সময় এখন

সম্পাদকীয়:

দেশের অপার সম্ভাবনাময় পাহাড়ি পর্যটন খাত, বিশেষ করে আলীকদম, বর্তমানে এক গভীর সংকটের মুখোমুখি। চরম অব্যবস্থাপনা, অনলাইনভিত্তিক ট্যুর গ্রুপগুলোর বেপরোয়া দৌরাত্ম্য এবং সুরক্ষাবিধির ধারাবাহিক লঙ্ঘনের কারণে এই খাত এখন ভঙ্গুর দশায়।

সম্প্রতি আলীকদমে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক দুর্ঘটনা, যেখানে ইতোমধ্যে দুটি তাজা প্রাণ ঝরে গেছে এবং একজন এখনো নিখোঁজ, তা এই খাতের দুর্বল চিত্রকে আবারও সামনে এনেছে। এটিকে নিছক দুর্ঘটনা না বলে, বরং দায়িত্বজ্ঞানহীনতার চূড়ান্ত মূল্য হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট মহল।

ট্র্যাজেডির পুনরাবৃত্তি ও নিয়মের লঙ্ঘন:

‘ট্যুর এক্সপার্ট’ নামক একটি ফেসবুক গ্রুপের অ্যাডমিন বর্ষা ইসলামের তত্ত্বাবধানে সংঘটিত এই ট্র্যাজেডি উদ্বেগজনক। ক্রিসতং রুংরাং সামিটের (৩০ তম) মতো ঝুঁকিপূর্ণ ইভেন্টে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ও অভিজ্ঞ গাইড ছাড়া ২২ জন পর্যটককে পাঠানো হয়েছিল, যেখানে আলীকদম প্রশাসন ও গাইড সমিতির নিয়ম অনুযায়ী প্রতি ১২ জন পর্যটকের জন্য একজন গাইড বাধ্যতামূলক।

সবচেয়ে দুঃখজনক হলো, বর্ষা ইসলামের সংশ্লিষ্টতায় পর্যটক মৃত্যুর ঘটনা এটিই প্রথম নয়; ২০২৩ সালে ভয়াবহ বন্যার সময় তার স্বামীরও একই ধরনের পরিস্থিতিতে মৃত্যু হয়েছিল। একই অপারেটর বৃত্তের মধ্যে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে বারবার এমন বেপরোয়া আচরণ তাদের দায়িত্বশীলতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।

অনলাইন গ্রুপের লাগামহীনতা:

শুধুমাত্র ‘ট্যুর এক্সপার্ট’ নয়, ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে পরিচালিত আরও অনেক অনলাইন ভিত্তিক গ্রুপ আলীকদম প্রশাসনকে ফাঁকি দিয়ে গাইডবিহীন বিশাল দল নিয়ে পাহাড়ের গভীরে প্রবেশ করছে।

অনভিজ্ঞ ব্যক্তিরা দ্রুত অর্থ উপার্জনের লোভে রাতারাতি ট্যুর অপারেটর বা হোস্ট সেজে বসছে। তাদের মধ্যে পাহাড়ের বিপদসংকুল পথে হাঁটার অভিজ্ঞতা, শারীরিক সক্ষমতা, টিম পরিচালনার জ্ঞান এবং যেকোনো পরিস্থিতিতে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতার যথেষ্ট অভাব পরিলক্ষিত হয়।

এর পাশাপাশি, কিছু ট্যুর গ্রুপের বিরুদ্ধে পাহাড়ি জনপদে নাচ-গান, উচ্চস্বরে বক্স বাজানো, অশ্লীলতা ছড়ানো, এমনকি কটেজ নির্মাণের নামে টাকা আত্মসাৎ বা স্থানীয়দের জুমের চাল ও মুরগি নিয়ে মূল্য পরিশোধ না করার মতো গুরুতর অভিযোগও রয়েছে। আলীকদম গাইড ও অন্যান্য ট্যুর হোস্টরা এসব বিষয়ে অবগত থাকলেও নিরুপায়।

প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ আবশ্যক:

এই ধরনের অনিয়ম ও মর্মান্তিক প্রাণহানি রোধে প্রশাসনের সুদৃষ্টি এবং কঠোর নীতিমালা প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি। স্থানীয় গাইড ও ট্যুর অপারেটরসহ সাধারণ মানুষ পাহাড়ে সুশৃঙ্খলভাবে ট্যুর পরিচালনা এবং পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জোর দাবি জানিয়েছেন। আলীকদমের এই ঘটনা বাংলাদেশের পাহাড়ি পর্যটন খাতের জন্য এক কড়া সতর্কবার্তা, যা অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।

ইতিবাচক দিক হলো, আলীকদমে আগত পর্যটকদের নিরাপত্তা ঝুঁকি রোধে উপজেলা নির্বাহী অফিসার আবদুল্লাহ আল মুমিন একটি সচেতনতামূলক মতবিনিময় সভার আয়োজন করেছেন। সোমবার (১৬ জুন) এই সভা অনুষ্ঠিত হবে।

আমরা আশা করি, এই সভা শুধু আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, আলীকদমের পর্যটন ব্যবস্থাপনার ত্রুটিগুলো চিহ্নিত করে একটি সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নে সহায়ক হবে এবং অনিয়ন্ত্রিত অনলাইন ট্যুর গ্রুপগুলোর লাগাম টানতে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। পর্যটকদের জীবনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে একটি নিরাপদ ও দায়িত্বশীল পর্যটন পরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের নৈতিক ও অপরিহার্য দায়িত্ব।

তবে, স্থানীয় বা জেলা প্রশাসনের প্রশাসনের অতিরিক্ত কড়াকড়ি ক্ষেত্রবিশেষে বাড়াবাড়ি যেন বিকাশমান আলীকদমের পর্যটনখাতকে কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত কিংবা বাধাগ্রস্ত না করে সেদিকে সকলকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানাই।