
মমতাজ উদ্দিন আহমদ, আলীকদম:
বান্দরবানের আলীকদম উপজেলায় ইয়াবা ও মাদক চোরাচালান সংক্রান্ত অপরাধ উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। মিয়ানমার সীমান্তের নৈকট্য এবং দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থান এই অঞ্চলকে মাদক পাচারের একটি প্রধান করিডোর হিসেবে চিহ্নিত করেছে। প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, আলীকদম কেবল মাদকের একটি ট্রানজিট পয়েন্ট নয়, বরং স্থানীয়ভাবেও এর ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা একটি জনস্বাস্থ্য সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই অবৈধ বাণিজ্য সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলির অর্থায়নের প্রধান উৎস হিসেবে কাজ করে, যা আঞ্চলিক অস্থিরতা ও সহিংসতাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। আলীকদম থানায় ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে মোট ৮ টি মাদক মামলা রজু হয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে।
মাদক চোরাচালান ও প্রয়োগের বর্তমান অবস্থা: লাগামহীন প্রবাহ, বাড়ছে গ্রেফতার:
আলীকদম উপজেলায় মাদক চোরাচালান দমনে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অভিযান চলমান থাকলেও, মাদকের প্রবাহ অপ্রতিরোধ্য। আলীকদমে ইয়াবা জব্দ ও মাদক কারবারী গ্রেফতার (২০২৩-২০২৫):
এই ধারাবাহিক জব্দ এবং গ্রেফতারগুলি আলীকদমে মাদক চোরাচালান কার্যক্রমের ব্যাপকতা এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সক্রিয়তা উভয়ই নির্দেশ করে। আলীকদম কেবল মাদকের একটি ট্রানজিট পয়েন্ট নয়, বরং স্থানীয়ভাবেও মাদকের ব্যবহার এখানে ব্যাপক। একাধিক তথ্যে ‘ইয়াবা (মাদক) সেবন’ অবস্থায় গ্রেফতারের ঘটনা নিশ্চিত করে যে, আলীকদম শুধুমাত্র মাদক পাচারের একটি পথ নয়, বরং এর স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যেও মাদকের ব্যবহার ব্যাপক আকার ধারণ করেছে, যা একটি ক্রমবর্ধমান জনস্বাস্থ্য সংকটের ইঙ্গিত দেয়।
মাদক চোরাচালান বৃদ্ধির চালিকা শক্তি: অরক্ষিত সীমান্ত ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর অর্থায়ন
আলীকদমে মাদক চোরাচালানের সমস্যাটি মিয়ানমার থেকে উদ্ভূত আঞ্চলিক মাদক উৎপাদন ও পাচার নেটওয়ার্কের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ অরক্ষিত রয়ে গেছে, যা চোরাকারবারিদের জন্য অসংখ্য প্রবেশপথ তৈরি করেছে।
মাদক ব্যবসা আলীকদম এবং বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের সশস্ত্র বিদ্রোহী ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক উৎস। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা নিশ্চিত করেছেন যে, পার্বত্য চট্টগ্রামে সক্রিয় কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ) মাদক পাচারকে অস্ত্র সংগ্রহের এবং তাদের বিদ্রোহমূলক কার্যক্রমকে সমর্থন করার একটি প্রধান উপায় হিসেবে ব্যবহার করে।
মাদক চোরাকারবারিরা অত্যন্ত অভিযোজিত এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অভিযানের প্রতিক্রিয়ায় তাদের কৌশল ও রুট ক্রমাগত পরিবর্তন করে। স্থলপথে নজরদারি বৃদ্ধির কারণে, চোরাকারবারিরা এখন গভীর সমুদ্রপথে মাদক পাচারের চেষ্টা করছে। নতুন স্থলপথও তৈরি হচ্ছে, যেমন রামুর উপজেলার গর্জনিয়া এবং কচ্ছপিয়া ইউনিয়ন, এবং বিশেষ করে নাইক্ষ্যংছড়ি, আলীকদম এবং উখিয়া দিয়ে গরু পাচারের আড়ালে মাদক পাচার করা হচ্ছে। চোরাকারবারিরা ‘উদ্ভাবনী’ পদ্ধতি ব্যবহার করে, যার মধ্যে গবাদি পশুর চালানের মধ্যে ইয়াবা এবং আইস লুকিয়ে রাখা অন্তর্ভুক্ত।
উল্লেখ্য যে, চোরাচালানরোধে ২০০৫ সালে টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ জেটিঘাট দিয়ে মিয়ানমারের গবাদিপশুর করিডর চালু করা হয়েছিল। রাজস্ব দিয়ে এই করিডরের মাধ্যমে ব্যবসায়ীরা গরু-মহিষ আনতেন। তবে ২০২২ সালে দেশীয় খামারিদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার এই করিডর বন্ধ করে দেয়। এরপর থেকে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি, আলীকদম ও কক্সবাজারের উখিয়ার সীমান্ত দিয়ে গরু চোরাচালান শুরু হয়। চোরাই পথে আসা গরুর বৈধতা দিতে ব্যবহৃত হচ্ছে গর্জনিয়া বাজার। বছরখানেক আগে থেকে আলীকদমে গরু চোরাচালান কমে এলেও এই ব্যবসার সূত্র ধরে চালু হওয়া মাদক চোরাচালান এখনো হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
স্থানীয় জনগোষ্ঠী, যার মধ্যে রোহিঙ্গারাও অন্তর্ভুক্ত, মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত হয়ে পড়ছে, প্রায়শই তারা নিম্ন-স্তরের বাহক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তথ্যে দেখা যায় যে, ‘ধনী ব্যক্তিরা’ প্রধান চোরাকারবারি হলেও, ‘গরিব মানুষ’ প্রায়শই বাহক হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
মাদক চোরাচালান নেটওয়ার্ক ও প্রভাব ও সামাজিক অবক্ষয়:
ইয়াবার প্রাথমিক উৎস মিয়ানমারের কারখানাগুলি, যা বিশেষভাবে বাংলাদেশের বাজারের জন্য বিভিন্ন ধরনের ইয়াবা উৎপাদন করে। মাদক বান্দরবান (আলীকদম, নাইক্ষ্যংছড়ি) এবং কক্সবাজার (টেকনাফ, উখিয়া, রামু) সহ মিয়ানমার সীমান্তের অসংখ্য দুর্বল পয়েন্ট দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে।
মাদক নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণকারী শক্তিশালী ‘গডফাদার’ এবং ‘মাফিয়া’ আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকলেও, এ পর্যন্ত খুচরা ব্যবসায়ী ও বাহকরাই গ্রেফতার হয়েছে। ‘শাহীন ডাকাত’ বা শাহীনুর রহমান (৩৭) নাইক্ষ্যংছড়ি এবং রামুর একজন শীর্ষ চোরাকারবারি। তার নেতৃত্বেই ২০১৪ সালের পর থেকে সীমান্তের চোরাচালানের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ রয়েছে। নাইক্ষ্যংছড়ি, আলীকদম এবং উখিয়ার সীমান্ত দিয়ে গরু পাচার শুরু হলে গরু পাচারের আড়ালেই সশস্ত্র পাহারায় ইয়াবা ও আইসের বড় চালান আনার রেকর্ড রয়েছে। শাহীন ডাকাতের এই সীমান্ত অঞ্চলের চোরাচালান সিন্ডিকেটের কোনো যোগসাজশ আলীকদমে রয়েছে তা খতিয়ে দেখা দরকার বলে মনে করছেন অনেকেই।
গত ৪ জুন আলীকদমের দুলাল অপহরণের অপহরণের নেপথ্যেও ইয়াবা কারবারের খবর পাওয়া যাচ্ছে। অপহরণকারীদের দাবী, বিগত কিছুদিন আগে স্থানীয় জনৈক আবুল কাশেম, রুহুল আমিন, জিয়াউল ও প্রদীন নামক ব্যক্তিরা তাদেরকে চেতনানাশক পানীয় দিয়ে বেহুশ করে তাদের কাছে থাকা ২৫ লক্ষ টাকার ইয়াবা ছিনতাই করে নিয়ে আসে। এই ঘটনার প্রতিশোধ হিসেবেই দুলালকে অপহরণ করা হয়েছিল বলে অপহরণকারীরা দাবি করেছে। তবে, অপহরণকারীদের এ দাবীর সত্যতা এখনো যাচাই করা যায়নি।
স্থানীয় সাংবাদিক জয়দেব বলেছেন, আলীকদমে মাদকের বিস্তার শুধু অপরাধ নয়, এটি এক গভীর সামাজিক সংকট। মাদক যুবসমাজকে প্রভাবিত করছে, যার ফলে নৈতিক ও সাংস্কৃতিক অবক্ষয় ঘটছে। তার মতে, মাদক ব্যবসা এক ছায়া অর্থনীতি তৈরি করেছে যা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে অর্থায়ন করছে এবং বৈধ অর্থনৈতিক উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করছে। জয়দেব আরও উল্লেখ করেন যে, মাদক ব্যবসা ক্রমবর্ধমান হারে বাড়লেও শুধু ছোটখাটো বাহকরা ধরা পড়ছে, কিন্তু মূল ‘ডিলার ও মাফিয়ারা’ ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাচ্ছে।
মাদক চোরাচালান দমনে চ্যালেঞ্জ: সীমাবদ্ধতা ও সমন্বয়ের অভাব:
আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলি সু-অর্থায়িত এবং সশস্ত্র মাদক সিন্ডিকেটগুলির তুলনায় মারাত্মকভাবে কম সম্পদ এবং প্রযুক্তিগতভাবে পিছিয়ে রয়েছে। আলীকদমে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) নেই। জেলায় থাকলেও তাদের জনবল সংকট, মাদক শনাক্তকরণের সরঞ্জামের অভাব, মোবাইল ফোন ট্র্যাকিংয়ের জন্য অপর্যাপ্ত সরঞ্জাম এবং অভিযানের জন্য যানবাহনের অভাব সহ উল্লেখযোগ্য সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি। ডিএনসি কর্মকর্তারা প্রায়শই নিরস্ত্র অবস্থায় মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করেন, যা তাদের সশস্ত্র চোরাকারবারিদের বিরুদ্ধে চরম ঝুঁকির মধ্যে ফেলে।
মাদক চোরাচালান ও মাদকসেবীর সংখ্যা বাড়ার বিষযে স্থানীয় সাংবাদিক হাসান মাহমুদ জানান, বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের আলীকদম অংশে প্রায় ৩৩ কিলোমিটার সীমান্ত কার্যত অরক্ষিত। রামু ব্যাটালিয়নের (৩০ বিজিবি) দুটি বিওপি (বর্ডার অবজারভেশন পোস্ট) আলীকদমের কুরুকপাতা ইউনিয়নে থাকলেও, এগুলো দিয়ে মাদক চোরাচালান কার্যত বন্ধ হচ্ছে না। হাসান মাহমুদের মতে, ‘দুটি বিওপি দিয়ে আলীকদম সীমান্তের বিশাল এলাকা নিরাপত্তার জন্য যথেষ্ট নয়।’ এই অরক্ষিত সীমান্ত দিয়ে মাদকের চালান আসায় আলীকদমের সামাজিক প্রেক্ষাপট হুমকির মুখে পড়েছে। মাদকের সহজলভ্যতা স্থানীয় যুবসমাজকে প্রভাবিত করছে এবং সামাজিক কাঠামোতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
স্থানীয় বিএনপি নেতা মু. জুলফিকার আলী ভূট্টো বলেন, ‘আলীকদম উপজেলায় ৫৭ বিজিবি’র (আলীকদম ব্যাটালিয়ন) সদর দপ্তর থাকলেও তাদের ৮টি ক্যাম্পের কার্যক্রম থানচি উপজেলায়। আলীকদম-মিয়ানমার সীমান্ত এলাকা দেখভালের দায়িত্বে রয়েছে রামু ব্যাটালিয়নের (৩০ বিজিবি) ক্যাম্প।’ তিনি বলেন, ‘রামু সদরে অবস্থিত ৩০ বিজিবি’র ক্যাম্প আলীকদমের পোয়ামুহুরী সীমান্ত এলাকায় দায়িত্ব পালন করলেও, তারা এ উপজেলার আইন-শৃঙ্খলার পরিস্থিতির জন্য জবাবদিহির আওতায় নেই। তাই ৩০ বিজিবির পরিবর্তে আলীকদমের সীমান্ত এলাকার দায়িত্বে ৫৭ বিজিবিকে দিলে এ চোরাচালান প্রতিরোধে কার্যকর হতে পারে।’
প্রতিরোধ কিভাবে:
মাদক চোরাচালানের এই হুমকি মোকাবিলায় একটি সমন্বিত, বহু-মাত্রিক এবং টেকসই জাতীয় প্রচেষ্টার প্রয়োজন বলে মনে করেন স্থানীয়রা। এরমধ্যে রয়েছে-
এ ব্যাপারে সম্প্রতি আলীকদম উপজেলা নির্বাহী অফিসার মুহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মুমিন জানান, আলীকদম উপজেলার সীমান্ত এলাকার দায়িত্ব যাতে ৫৭ বিজিবি’র আওতায় আনা যায় সে প্রস্তাব উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, জেলার মিটিংসমূহে এ সংক্রান্ত প্রস্তাব আমরা দিতে পারি, বাস্তবায়নের এখতিয়ার স্থানীয় প্রশাসনের নেই। তিনি বলেন, মাদক চোরাচালানরোধে প্রশাসন সক্রিয় আছে।
সম্পতি একটি মতবিনিময় সভায় আলীকদমের সীমান্ত এলাকায় ৫৭ বিজিবি’র ক্যাম্প স্থাপন নিয়ে উর্ধ্বতন মহলে প্রস্তাব আছে বলে জানিয়েছেন আলীকদম ব্যাটালিয়নের (৫৭ বিজিবি) অধিনায়ক লেঃ কর্ণেল আব্দুল্লাহ আল মেহেদী।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, আলীকদম এবং বৃহত্তর অঞ্চলের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত রাখতে এই সর্বব্যাপী হুমকিকে কার্যকরভাবে মোকাবিলা করার জন্য একটি দৃঢ় এবং অবিচল অঙ্গীকার অপরিহার্য।
প্রতিবেদক: সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান পার্বত্য জেলা, ১১ জুন ২০২৫।
আপনার মতামত লিখুন :