
মমতাজ উদ্দিন আহমদ, আলীকদম:
পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে যখন কোনো ধার্মিক বান্দা আলীকদমে পৌঁছান, তখন চোখে পড়ে পৌনে একশত বছরের প্রাচীন সেই মসজিদ—শত বছরের ক্লান্তি যেন তার দেয়ালে স্পষ্ট। বহু প্রজন্মের আজান, তাকবির আর দোয়ার ধ্বনি বহন করা এই মসজিদটিকে ঘিরে আছে এক অবর্ণনীয় ইতিহাস। কিন্তু সময়ের প্রয়োজনে এখন সে ইতিহাস নতুন রূপে গড়ে উঠতে যাচ্ছে।
আলীকদম কেন্দ্রীয় জামে মসজিদকে ঘিরে তৈরি হয়েছে এক মাস্টার প্ল্যান, যেখানে ধর্মীয় আবহ ও আধুনিক স্থাপত্য একাকার হয়ে গেছে।
নতুন পরিকল্পনায় মূল নামাজকক্ষ এতটাই প্রশস্ত যে, আট লাইনের কাতারে একসাথে অসংখ্য মুসল্লি দাঁড়াতে পারবেন। উত্তর প্রান্তে থাকবে মিহরাব—যেখানে ইমাম দাঁড়িয়ে তাকবির উচ্চারণ এবং নামাজের ইমামতি করবেন। এর পাশেই রাখা হবে জানাজা নামাজের আগে মৃতদেহ রাখার স্থান, যেন শোকের মুহূর্তেও থাকে মর্যাদার আবহ। কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে এতদিন জানাজার নামাজ পড়ানোর ব্যবস্থা ছিলো না। নতুন পরিকল্পনায় মসজিদ নির্মাণ হলে জানাজার নামাজ পড়ানোর ব্যবস্থা মসজিদেই হবে।
মসজিদের সামনের বারান্দা হবে খোলা বাতাসের মতো স্বচ্ছন্দ, যেখানে অতিরিক্ত আরও তিন লাইনের কাতার নামাজ পড়তে পারবে।
পরিকল্পনায় সবচেয়ে অভিনব বিষয় হলো নারী-পুরুষের আলাদা প্রবেশপথ। বর্তমানে এই মসজিদে নারীদের নামাজ পড়ার ব্যবস্থা নেই। প্রস্তাবিত প্ল্যানে নারীদের জন্য নামাজ পড়ার ব্যবস্থা গড়ে তোলা হব। পুরুষদের জন্য থাকবে মূল দরজা, আর নারীদের জন্য বিশেষভাবে নির্ধারিত উইমেন গেট। সেখান দিয়েই সিঁড়ি বেয়ে সরাসরি প্রথম তলায় প্রবেশ করা যাবে। যেন ইবাদতের সুযোগ হয় সবার জন্য, কিন্তু শালীনতা ও স্বাচ্ছন্দ্য বজায় রেখেই।
নামাজের আগে অজু করা মুসল্লিদের জন্য আলাদা একটি অজুখানা ও ওয়াশ জোন তৈরি হবে, যেখানে একসাথে বহু মানুষ অজু করতে পারবেন। পাশেই থাকবে তিনটি সুষ্ঠুভাবে নির্মিত টয়লেট। ইমাম ও মুয়াজ্জিনের জন্য থাকবে একটি নিরিবিলি কক্ষ—তাদের ইবাদত, পাঠ ও প্রস্তুতির জন্য। থাকবে পাঠাগারের ব্যবস্থাও।
মসজিদের দু’পাশে সিঁড়ির সাথে লাগোয়া যে দু’টি দৃষ্টিনন্দন মিনার নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে, তা ইসলামী স্থাপত্যের এক অনবদ্য ঐতিহ্য বহন করবে। ইসলামী সভ্যতায় মিনার শুধু নান্দনিকতার প্রতীক নয়, বরং আধ্যাত্মিক আহ্বানের মাধ্যম হিসেবেও গুরুত্ব বহন করে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মিনার থেকেই মুয়াজ্জিনের কণ্ঠে আযান ধ্বনিত হয়ে বিশ্ব মুসলিম সমাজকে নামাজের ডাক পৌঁছে দিয়েছে। একইসাথে মিনার স্থাপত্যশৈলীর এক অনন্য সৌন্দর্য, যা দূর থেকে দেখলেই মসজিদের উপস্থিতি জানান দেয়। আলীকদম কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের প্রস্তাবিত এই দু’টি মিনার স্থানীয়দের কাছে যেমন এক গর্বের প্রতীক হয়ে উঠবে, তেমনি ইসলামী স্থাপত্য ঐতিহ্যের সাথেও মিলবে এক মহিমান্বিত সেতুবন্ধন।
মসজিদের সীমানা প্রাচীর ঘিরে থাকবে সবুজ গাছপালা ও ফুলের বাগান। প্রধান বাউন্ডারি গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকলেই চোখে পড়বে সেই সুশৃঙ্খল নকশা। আর রাস্তার সাথে সরাসরি সংযুক্ত এই মসজিদে মুসল্লিদের যাতায়াত হবে সহজ, নিরাপদ ও প্রশান্তিময়।
এই মসজিদ নির্মাণের স্বপ্ন যেন শুধু একটি স্থাপনা নয়, বরং আলীকদমের মানুষের ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনের নতুন অধ্যায়। প্রাচীনতার সাথে আধুনিকতার মেলবন্ধনে দাঁড়িয়ে থাকবে এটি এক আলোকবর্তিকা, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে দেবে শান্তি, সৌন্দর্য আর ইবাদতের মহিমা।
এলাকাবাসীর ভাষায়—
“এই মসজিদ শুধু পাথর আর ইটের নির্মাণ নয়, বরং এটি আমাদের বিশ্বাস, ঐক্য আর আগামী দিনের আস্থার প্রতীক।”
সম্প্রতি স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের দাবির মুখে বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অধ্যাপক থানজামা লুসাই ঘোষণা দেন—আলীকদম কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ আধুনিক স্থাপত্যকলায় নতুন করে নির্মাণ করা হবে। এসময় তিনি মসজিদটির পুনঃনির্মাণে একজন আর্কিটেক্ট ইঞ্জিনিয়ারের পরামর্শক্রমে একটি পূর্ণাঙ্গ মাস্টার প্ল্যান প্রণয়নের দিকনির্দেশনা দেন। তাঁর এই ঘোষণার পর জেলা পরিষদ থেকে ইতোমধ্যে একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ সদস্য সাইফুল ইসলাম রিমন জানান, চলতি অর্থবছরে চেয়ারম্যানের বিশেষ বরাদ্দ থেকে মসজিদটি পুনঃনির্মাণের জন্য প্রকল্প তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, মন্ত্রণালয় থেকে প্রকল্প প্রস্তাব অনুমোদিত হলে দ্রুতই কাজ শুরু করা সম্ভব হবে।
আপনার মতামত লিখুন :