
মমতাজ উদ্দিন আহমদ, আলীকদম (বান্দরবান): দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ভ্রমণপিপাসুদের কাছে এখন এক নতুন আকর্ষণ হয়ে উঠেছে বান্দরবানের আলীকদম উপজেলায় অবস্থিত দুর্গম ক্রিসতং ও রুংরাং পাহাড়ের চূড়া। অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমী পর্যটকদের কাছে এই দুটি চূড়া কেবল চ্যালেঞ্জিং ট্রেকিং রুট নয়, বরং প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য, বন্ধুত্বের উষ্ণতা ও পাহাড়ি ম্রো সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রা কাছ থেকে দেখার এক অনন্য সুযোগ।
ক্রিসতং ও রুংরাং নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে স্থানীয় মারমা ভাষার এক বিশেষ ইতিহাস। মারমা ভাষায় ‘ক্রিস’ একটি পাখির নাম এবং ‘তং’ শব্দের অর্থ পাহাড়। অন্যদিকে, রুংরাং অর্থ হলো ধনেশ পাখি, যেখানে একসময় প্রচুর ধনেশ পাখির আনাগোনা ছিল। এই দুটি চূড়া তাই কেবল পাহাড় নয়, বরং জীববৈচিত্র্য ও ইতিহাসের নীরব সাক্ষী।

তবে এই অপরূপ সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক উদ্বেগজনক চিত্র। সাম্প্রতিক সময়ে কিছু কাঠ পাচারকারী চক্র ক্রিসতং পাহাড়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অনেকাংশে ধ্বংস করেছে। অভিযোগ উঠেছে, চকরিয়া এবং স্থানীয় কয়েকজন কাঠ ব্যবসায়ী ক্রিসতংয়ের গহিন অরণ্যে নির্বিচারে গাছ কেটে তা পাচার করার জন্য মাটি কেটে রাস্তা পর্যন্ত তৈরি করা হয়েছে।
জানা গেছে, আলীকদম-থানচি সড়কের ২১ কিলোমিটার পয়েন্ট থেকে যে সাড়ে সাত কিলোমিটার নতুন রাস্তা নির্মিত হয়েছে, তার সুযোগ নিয়ে কাঠ ব্যবসায়ীরা সেই সড়কের ৩ কিলোমিটার অংশ থেকে ক্রিসতংয়ের দিকে মাটির রাস্তা তৈরি করেছে। এ রাস্তা তৈরিতে দিনের পর দিন স্কেভেটর ব্যবহার করা হলেও সংশ্লিষ্ট প্রশাসন এক্ষেত্রে নীরব ভূমিকা পালন করছে। একসময় যেখানে পশু-পাখির কলকাকলি শোনা যেত, সেখানে মাঝে মাঝে শোনা যায় বৃক্ষ নিধনের করাত ও স্কেভেটরের বিকট শব্দ।
ক্রিসতং ও রুংরাং ভ্রমণের সবচেয়ে আনন্দময় দিক হলো প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের একাত্ম হওয়া এবং দলগতভাবে কাটানো মুহূর্তগুলো। পাহাড়ের নির্জন চূড়ায় টর্চের আলো নিভিয়ে সবার একসঙ্গে বসে মেঘেদের শরীর ছুঁয়ে যাওয়া অনুভব করা, কিংবা বাঁশের ঘরের ফাঁক দিয়ে কুয়াশার মতো মেঘের ঘরে ঢুকে পড়াকে উপভোগ করা—এসব অভিজ্ঞতা শহুরে জীবনের কোলাহল থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। দীর্ঘ ট্রেকিংয়ের পর কলাপাতায় বসে শুকনো খাবার ভাগ করে খাওয়া, স্থানীয় উপায়ে রান্না করা গরম গরম খিচুড়ি আর ডিমের স্বাদ নেওয়া এবং রাতে একসঙ্গে আড্ডা দেওয়া এই ভ্রমণের স্মৃতিকে আরও মধুর করে তোলে।

পর্যটকরা ম্রো পাড়াগুলোতে (যেমন: খেমচংপাড়া ও মেনিয়াংপাড়া) অবস্থানকালে স্থানীয়দের সহজ-সরল জীবনযাত্রা, সংস্কৃতি এবং উষ্ণ আতিথেয়তার সংস্পর্শে আসেন। ফেরার পথে তৈন খালের বুক চিরে নৌকায় চলতে চলতে পাহাড়ি জীবন, জুমক্ষেত ও মাছ ধরার দৃশ্য দেখা এক ভিন্ন অনুভূতির জন্ম দেয়। এই অভিযাত্রা তাই শুধু শারীরিক ট্রেকিং নয়, বরং প্রকৃতি, বন্ধুত্ব ও সংস্কৃতির সঙ্গে এক গভীর আত্মিক মেলবন্ধনের নাম, যা প্রতিটি ভ্রমণকারীর মনে চিরস্থায়ী ছাপ ফেলে যায়।
* যাতায়াতঃ আলীকদম-থানচি সড়কের ১৩ কিঃ মিঃ>দোছরি ঝিরি>মেনকিউ পাড়া>মেনইয়ং পাড়া>খ্যামচন পাড়া>ক্রিস তং। তৈনখাল দিয়েও নৌকাযোগে যাওয়া যায়। সেক্ষেত্রে আমতলী ঘাট থেকে যাত্রা শুরু করতে হবে।
* আলীকদম-থানচি সড়কের ২১ কিলোমিটার থেকে তিন্দু সড়ক পথেও ক্রিসংতং যাওয়া যায়।
আপনার মতামত লিখুন :