
ভোরের আলো নরম। পাহাড়ের চূড়ায় হিমশীতল পরিবেশ। সূর্যটা তখন লাল টিপের মতো দেখাচ্ছে। কুয়াশা তাকে ঢেকে রেখেছে। সবুজাভ পাহাড়ের কোল ঘেঁষে বয়ে চলে মাতামুহুরী নদী। তার প্রবাহ শান্ত, চঞ্চলা ও স্বপ্নিল। ঠিক এই সময়েই মন এক অন্যরকম আবেশে জড়িয়ে যায়।
নদীর তীরে মৃদু শৈবালিনী দেখা যায়। উৎকণ্ঠিত নয়নের সামনে এটি এক মনোরম চুম্বকের মতো। তটিনীর ঢেউ আর সবুজের গুঞ্জন শোনা যায়। তারা যেন শুভ্র-স্নিগ্ধ অনুরাগে মনকে জড়িয়ে ধরে। এটি এক কমনীয় দেহের শীতল আলিঙ্গনের মতো।
ছায়াছন্ন পাহাড়ের অস্পষ্ট রূপ চোখে পড়ে। অস্থির সময়ের ভিড়েও তা সকলকে প্রশান্তি দেয়। এই পাহাড়ের ছবি সকলের প্রাণে প্রাণে জন্ম নেয়। এই নিবিড় প্রশান্তি মন-পবনকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। তা চলে যায় গিরিধারী অববাহিকায়।
এই নৈসর্গিক সৌন্দর্য আমাদের মুগ্ধ করে। এটি অচিনপুরে হারিয়ে যেতে শেখায়। শুভ্র সবুজের ঝিকিমিকি মায়ামোহে চন্দন মাখা যায়। এ যেন আকাশ ছুঁয়ে আসার এক দুরন্ত আকাঙ্ক্ষা।
পাহাড়টি অধরা। এটি পুলকিত ও শিহরণ জাগানো স্বপ্নিল। এর নিশিকায়ার বুকে হেলান দিয়ে ঘুমানো যায়। কখনো তার বক্ষে মিশে যাওয়া যায়। আহা, সে যে কি অপার্থিব প্রশান্তি!
এই নিবন্ধে মাতামুহুরী নদীর সম্পর্ক আলোচনা করা হবে। এর পারিপার্শ্বিক প্রকৃতির গভীরতাও উন্মোচন করা হবে। এটি একটি রোমান্টিক ও বহুমাত্রিক সম্পর্ক। প্রকৃতি এখানে শুধু দৃশ্যপট নয়। এটি মানবমনের একাত্মতা ও আত্মিক শান্তির উৎস।
মাতামুহুরীর বহুরূপী সত্তা: জীবন ও ধ্বংসের কাব্য
মাতামুহুরী নদী এক স্রোতস্বিনী। এটি ধেয়ে চলে এঁকেবেঁকে। মোহনার পানে তার এই ছুটে চলা এক অবিরাম জীবনচক্রের প্রতীক। বাংলাদেশ-মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী পর্বতে হাজার বছর ধরে আছে পানির উৎস! পাহাড়ের বুক থেকে আসা পানিতে পুষ্ট হয় নদী। এটি লামা, আলীকদম, চকরিয়া ও পেকুয়ার বুক চিরে যায়। এরপর কাঙ্ক্ষিত সাগরসঙ্গমের দিকে এগিয়ে চলে।
নদীর দুই ধারে ভূমি সাজে অবিরাম রূপে। এখানেই গড়ে উঠেছে সমৃদ্ধ জনপদ। এখানে হিন্দু-মুসলমান, বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান সহাবস্থান করে। বাঙালি ও মঙ্গোলয়েড জাতিগোষ্ঠী এখানে পাশাপাশি থাকে। অরণ্য, কাশবন, বাঁশঝাড়, বালুচর, হাটবাজার এর অংশ। খেয়া পারাপারও মাতামুহুরীর অবিচ্ছেদ্য অংশ।
মাতামুহুরী শুধু সৌন্দর্য ও সমৃদ্ধির প্রতীক নয়। এটি জীবন ও ধ্বংসের দ্বৈত রূপের ধারক। বৈশাখ মাসে এর জল হাঁটু সমান থাকে। কিন্তু আষাঢ়ে তা ঢলে রূপান্তরিত হয়। এই ঢল শহর-নগর ভাসিয়ে দেয়। হাটবাজারও ডুবিয়ে ফেলে।
এই এক রূপ যেমন উর্বরতা আনে। এটি ভূমিকে কাঁদা পলি দিয়ে উর্বর করে। তেমনি এর অন্য রূপ কারো সর্বনাশ করে। এটি জীবনেরই এক প্রতিচ্ছবি। এখানে সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না দুটোই থাকে।
কবি এমডি জিয়াবুল লিখেছেন, “তোমার ঐ বুকে চলে কতো কল যান, গাই মাঝি কতো সুরে ভাটিয়ালি গান”। এই পঙক্তি জীবন প্রবাহের ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু একসময় নদী ছিল প্রমত্তা। তখন এর মিঠে নোনা জলে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ দেখা যেত। সেই দিন এখন শুধু সুখস্মৃতি। এই পঙক্তিগুলো নদীর বর্তমান দুর্দশা বোঝায়।
বৃষ্টিস্নাত তারুণ্য ও কল্পনার অমরত্ব
মাতামুহুরীর তীরে বৃষ্টি কেবল জল নয়। এটি মানব মনের গভীরে প্রবেশ করে। এক নতুন অনুভূতি জাগায়। রাসুল (সা.) বলেছেন, বৃষ্টি আল্লাহর প্রসাদ ও কৃপা। এটি স্বাগত জানানোর যোগ্য। বৃষ্টি যখন মেঘলোকের স্বচ্ছতা নিয়ে ভূপৃষ্ঠে মেশে, তখন শুধু মাটি নয়, মানবমনের অলিন্দেও শিহরণ জাগে।
ছোটবেলায় মাতামুহুরীর পাড়ে বৃষ্টিতে ভেজার স্মৃতি মনে পড়ে। নদীর বুকে বৃষ্টির অলৌকিক নাচনও মনে আসে। এ সবই শৈশবের নির্ভেজাল আনন্দের প্রতীক।
যৌবনে বৃষ্টি ভিন্ন মাত্রা পায়। “বৃষ্টির ভেজা স্পর্শ” গল্পে দেখেছি, বৃষ্টিময় সন্ধ্যা ভালোবাসা জন্ম দেয়। অয়ন ও অরুণিমার হৃদয়ে গভীর নির্ভরতা আসে। “মাতামুহুরীর তীরে এক স্বপ্নিল সন্ধ্যা” এক রোমান্টিক গল্প। বৃষ্টির আবহে এক কিশোরের মনে প্রথম ভালো লাগা আসে। সেই রহস্যময়ী নারী তার কল্পনার গভীরে অমর হয়ে থাকে। এই নারী হয়তো নিছক কল্পনা। তবে তার প্রভাব জীবনের পথে নতুন প্রেরণা হয়ে ওঠে।
মাতামুহুরী মানে পাহাড়ি একদেশের প্রাণ-প্রকৃতি অনিশেষ দান। এখানে মিশে আছে বৃষ্টি ও যৌবন। আছে হৃদয়ের সিক্ত আকুলতা। এ নদীকে ঘিরে আছে তীরবর্তী মানুষের আবেগ, আকাঙ্ক্ষা ও প্রশান্তি। রয়েছে কৃষিজীবিদের বাঁচার অবলম্বন।
মাতামুহুরীর নিসর্গকে ঘিরে থাকা প্রেম ও বিরহের কাব্য কবিমনে সমৃদ্ধ হয়। বৃষ্টির ছোঁয়ায় নিষ্প্রাণ প্রকৃতি জেগে ওঠে। তেমনই যৌবনের স্পর্শে ফুল নতুন রূপ পায়। সবুজ ধানের শীষ নুয়ে পড়ে, আবার মাথা তোলে। এটি তারুণ্যের দ্বিধা ও সাহসের প্রতীক।
অনন্ত প্রবাহে আত্মিক বন্ধন
মাতামুহুরী নদী এক জীবন্ত সত্তা। এটি ঋতুচক্রের তালে তালে তার রূপ বদলায়। মানবজীবনের সঙ্গে এর নিবিড় সংযোগ আছে। গ্রীষ্মের খরতাপে নদীর বুক শুকিয়ে যায়। তখন হৃদয়ে হাহাকার জাগে। কিন্তু মানুষ ছুটে আসে নদীর তীরে। “একটু চৈতালি হাওয়া, হিমজলের ছোঁয়া পেতে তোমার তীরে-বুকে / আবালবৃদ্ধের এ কী ছুটাছুটি” —এই দৃশ্য প্রমাণ করে মানুষের ভালোবাসা অবিচল।
নদীটি কেবল ভৌগোলিক সত্তা নয়। এটি এই অঞ্চলের মানুষের স্বপ্ন, স্মৃতি, প্রেম, বিরহ ও জীবন-দর্শনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
“মাতামুহুরীর তীরে এক স্বপ্নিল আবেশ” থেকে শুরু করে “মেঘ-বরণ কেশের পানে বৈরাগী মনের আর্তি” পর্যন্ত, এই নদী আমাদের প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হতে শিখিয়েছে। এটি শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নয়। এটি মানবমনের গভীরতম অনুভূতির প্রতিচ্ছবি। নদী যখন প্লাবিত হয়, তখন ধ্বংস আসে। কিন্তু উর্বরতাও আসে। ঠিক তেমনই জীবনেও সুখ-দুঃখের চক্রে আমরা বেড়ে উঠি। পরিশেষে, মাতামুহুরীর এই অনন্ত প্রবাহ আছে। এর পারিপার্শ্বিক প্রকৃতির সাথে মানুষের আত্মিক বন্ধনও আছে। এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, জীবন পরিবর্তনশীল। তবে প্রকৃতির সৌন্দর্য ও শান্তি চিরন্তন।
লেখক: সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান পার্বত্য জেলা।
তারিখ: ১২ জুন ২০২৫ খ্রি.
আপনার মতামত লিখুন :