ইনসাফের রাজনীতি: বান্দরবান জেলা পরিষদে ন্যায্য প্রতিনিধিত্বের আবশ্যকতা


Momtaj Uddin Ahamad প্রকাশের সময় : ফেব্রুয়ারী ২৮, ২০২৬, ৫:৩৯ পূর্বাহ্ন /
ইনসাফের রাজনীতি: বান্দরবান জেলা পরিষদে ন্যায্য প্রতিনিধিত্বের আবশ্যকতা

✍️ ।। মমতাজ উদ্দিন আহমদ ।।


ভূমিকা: বৈচিত্র্যের ভেতর লুকানো অস্থিরতা

বান্দরবান পার্বত্য জেলা বাংলাদেশের এক অনন্য ভূ-রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অঞ্চল। এখানে পাহাড়, প্রকৃতি ও মানুষের সহাবস্থান কেবল নান্দনিক নয়—এটি একটি জটিল সামাজিক বাস্তবতা। ১১ থেকে ১৪টি ক্ষুদ্র জাতিসত্তার শতাব্দীপ্রাচীন বসতি এই অঞ্চলে এক বহুত্ববাদী সমাজের জন্ম দিয়েছে। কিন্তু এই বহুত্বই আজ এক ধরনের রাজনৈতিক টানাপোড়েন, প্রতিনিধিত্ব সংকট ও মানসিক বিভাজনের রূপ নিচ্ছে।

জেলা পরিষদ পুনর্গঠনকে কেন্দ্র করে বারংবার যে অস্থিরতা ও গোষ্ঠীগত মনস্তত্ত্বের সংঘাত তৈরি হয়ে থাকে, তা কেবল প্রশাসনিক সংকট নয়—এটি একটি গভীর সমাজতাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক সংকট। এই প্রেক্ষাপটে মধ্যযুগীয় সমাজচিন্তক ইবনে খলদুনের ‘আসাবিয়্যা’ তত্ত্ব নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।

১. খলদুনীয় ‘আসাবিয়্যা’: সংহতি না বিভাজনের রাজনীতি?

ইবনে খলদুন তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ মুকাদ্দিমা-তে ‘আসাবিয়্যা’কে রাষ্ট্র ও সমাজের প্রাণশক্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এটি এমন এক সামাজিক বন্ধন, যা একটি জনগোষ্ঠীকে ঐক্যবদ্ধ করে, সংগ্রামে সক্ষম করে এবং ক্ষমতার কাঠামোকে স্থিতিশীল রাখে।

কিন্তু খলদুন সতর্ক করেছেন—যখন এই আসাবিয়্যা ন্যায়বিচার (ইনসাফ) থেকে বিচ্যুত হয় এবং একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর একচেটিয়া আধিপত্যে পরিণত হয়, তখন তা সংহতির বদলে বিভাজনের জন্ম দেয়।

বান্দরবানের বিদ্যমান রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় আমরা এই তত্ত্বের প্রতিফলন স্পষ্টভাবে দেখতে পাই। জেলা পরিষদের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে চাকমা, তঞ্চঙ্গ্যা, খুমী, খেয়াংসহ বিভিন্ন জাতিসত্তার মধ্যে এক অদৃশ্য প্রতিযোগিতা ও অবিশ্বাসের দেয়াল তৈরি হচ্ছে। এটি কোনো তাৎক্ষণিক ঘটনা নয়—বরং দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, অসম প্রতিনিধিত্ব এবং রাজনৈতিক দুরভিসন্ধি ও প্রান্তিকতার ফল।

খলদুনের ভাষায়, এই পরিস্থিতি ‘আসাবিয়্যার অবক্ষয়’—যেখানে ঐক্যের জায়গায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা স্থান নেয়।

৩. প্রতিনিধিত্বের সংকট ও ‘রাজনৈতিক প্রান্তিকতা’:

গণতান্ত্রিক কাঠামোয় প্রতিনিধিত্ব শুধু ক্ষমতার অংশীদারিত্ব নয়—এটি স্বীকৃতি, মর্যাদা এবং অস্তিত্বের প্রশ্ন। বান্দরবানে দীর্ঘ ২৮ বছর ধরে একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীর (চাকমা) জেলা পরিষদে প্রতিনিধিত্ব না থাকা কেবল একটি প্রশাসনিক বিচ্যুতি নয়; এটি রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতার একটি সুস্পষ্ট উদাহরণ।

এই ধরনের দীর্ঘমেয়াদি বঞ্চনা একটি সম্প্রদায়ের মধ্যে ‘অদৃশ্য ক্ষোভ’ তৈরি করে, যা প্রকাশ্য সংঘাতে না গেলেও সামাজিক সম্পর্কের ভেতরে ফাটল সৃষ্টি করে। একইভাবে অন্যান্য ক্ষুদ্র ও অনগ্রসর জাতিসত্তার মধ্যেও ‘অংশীদারিত্ব বঞ্চনা’ অনুভূত হয়, যা সামগ্রিকভাবে পাহাড়ের সামাজিক সংহতিকে দুর্বল করে। পাশাপাশি চেয়ারম্যান ও সদস্য অন্তর্ভূক্তিতে জেলা সদরকে প্রধান্য দেওয়া রাজনৈতিক দলগুলোর পাহাড়ের নেতৃত্বের হীনমানসিকতার পরিচয় বহন করে।

রাজনীতির ভাষায় একে বলা যায়—“representation deficit (প্রতিনিধিত্বের ঘাটতি)”, আর সমাজবিজ্ঞানের ভাষায়—“structural exclusion (কাঠামোগত বর্জন)”।

৩. কেন্দ্র বনাম প্রান্ত: ক্ষমতার ভৌগোলিক বৈষম্য:

বান্দরবানের রাজনৈতিক কাঠামোয় একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হলো—ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ। জেলা সদরকেন্দ্রিক নেতৃত্বের কারণে আলীকদম, লামা, থানচি, রুমা, রোয়াংছড়ি বা নাইক্ষ্যংছড়ির মতো প্রান্তিক উপজেলাগুলোর বাস্তবতা প্রায়ই উপেক্ষিত হয়।

কিন্তু এই উপজেলাগুলোই পাহাড়ের প্রকৃত চিত্র বহন করে—দারিদ্র্য, যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা, নিরাপত্তা সংকট—সবকিছুই এখানে তীব্রতর।

প্রশ্ন হলো: যে মানুষের সমস্যা টেবিলে আসে না, তার সমাধান কি কখনো হয়?

উপজেলাভিত্তিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা মানে শুধু প্রশাসনিক ভারসাম্য নয়—এটি একটি রাজনৈতিক ন্যায়বিচার। এটি ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, অংশগ্রহণমূলক শাসন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের ভিত্তি।

৪. জাতিসত্তা রাজনীতি: সহাবস্থান না প্রতিযোগিতা?

বান্দরবানের জাতিসত্তাগুলোর মধ্যে সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে সহাবস্থানের হলেও আধুনিক রাজনৈতিক কাঠামো সেই সম্পর্ককে অনেক ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতায় রূপ দিয়েছে। কে প্রতিনিধি হবে, কে সুবিধা পাবে, কে প্রাধান্য পাবে—এই প্রশ্নগুলো ধীরে ধীরে সামাজিক সম্প্রীতিকে চ্যালেঞ্জ করছে।

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— সংখ্যাগুরু বনাম সংখ্যালঘু নয়, বরং ন্যায্য অংশীদারিত্ব।

খলদুনীয় দর্শনে সংখ্যালঘুর সুরক্ষা শুধু নৈতিক দায়িত্ব নয়, এটি রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার শর্ত। একটি গোষ্ঠী যদি নিজেকে বঞ্চিত মনে করে, তবে সে কখনোই বৃহত্তর সামাজিক চুক্তির অংশ হতে পারে না।

৫. প্রশাসন, ইনসাফ ও আস্থার সংকট:

যে কোনো রাষ্ট্র বা অঞ্চলে প্রশাসন হলো ন্যায়বিচারের প্রতীক। কিন্তু যখন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলোতে পক্ষপাত, গোষ্ঠীগত প্রভাব বা অস্বচ্ছতা দেখা দেয়, তখন জনগণের আস্থা ক্ষুণ্ন হয়।

বান্দরবান জেলা পরিষদের বিভিন্ন সময় অভিযোগ উঠেছে— প্রকল্প গ্রহণে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীগত সুবিধা, পরিষদের তখ্‌তে তখ্‌তে একটি সম্প্রদায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের আধিক্য, কিছু সম্প্রদায়ের শিক্ষিতজনদের এসব নিয়োগে সুযোগ প্রদানে অনীহা বা অস্বস্তি প্রদর্শনের। এটি যদি সত্য হয়, তবে তা কেবল প্রশাসনিক দুর্বলতা নয়—এটি সামাজিক বৈষম্যের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ।

একটি কার্যকর প্রশাসনের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত— যোগ্যতা, নিরপেক্ষতা এবং অন্তর্ভুক্তি।

৬. রাজনৈতিক পুনর্গঠন: সংকট না সুযোগ?

বর্তমান পরিস্থিতিকে কেবল সংকট হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি একটি সুযোগও—একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার সুযোগ।

এই পুনর্গঠনের মাধ্যমে—

  • প্রতিনিধিত্বের ভারসাম্য আনা সম্ভব
  • প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বর তুলে ধরা সম্ভব
  • গোষ্ঠীগত অবিশ্বাস দূর করা সম্ভব
  • একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক কাঠামো নির্মাণ করা সম্ভব।

উপসংহার: ইনসাফভিত্তিক আসাবিয়্যার পথেই সমাধান

বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ কোনো সাধারণ প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান নয়; এটি পাহাড়ের মানুষের আশা, আস্থা ও সহাবস্থানের প্রতীক।

যদি এখানে প্রতিটি জাতিসত্তা—সংখ্যায় বড় বা ছোট—নিজেকে প্রতিনিধিত্বশীল মনে করে, তবে সেটিই হবে প্রকৃত ‘আসাবিয়্যা’। আর যদি কেউ বঞ্চিত থাকে, তবে সেই সংহতি ভঙ্গুর হয়ে পড়বে।

মাননীয় পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রীর প্রতি বিনীত আহ্বান—
জেলা পরিষদ পুনর্গঠনে কেবল ক্ষমতার ভারসাম্য নয়, বরং ইতিহাসের বঞ্চনা, প্রান্তিকতার বাস্তবতা এবং সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্ন বিবেচনায় নিন।

প্রতিনিধিত্বহীন সম্প্রদায়সহ সকল অনগ্রসর ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ন্যায্য অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

মনে রাখতে হবে—
কাউকে পেছনে রেখে উন্নয়ন নয়,
সবার অংশগ্রহণেই টেকসই শান্তি ও অগ্রগতি সম্ভব।

ইনসাফ প্রতিষ্ঠিত হলেই বান্দরবান হবে সত্যিকারের সম্প্রীতির মডেল—বাংলাদেশের জন্য, এমনকি বিশ্বের জন্যও।

লেখক: সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান পার্বত্য জেলা।

তারিখ: ২৮.০২.২০২৬ খ্রি.।