
মমতাজ উদ্দিন আহমদ, আলীকদম:
পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি ভূদৃশ্যের ভাঁজে ভাঁজে জন্ম নেওয়া মাতামুহুরী নদী কেবল জলধারা নয়—এ এক জীবন্ত ইতিহাস। বাংলাদেশ–মিয়ানমার সীমান্তবর্তী দুর্গম পাহাড় থেকে উৎপত্তি হয়ে বঙ্গোপসাগরে মিলিত হওয়া এই নদী যুগ যুগ ধরে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জীবন, জীবিকা, সংস্কৃতি ও স্মৃতির সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে। মায়ের নামের সঙ্গে যুক্ত এই নদী তাই কেবল প্রকৃতির সৃষ্টি নয়; এটি মানুষের অনুভব, ভালোবাসা ও বেঁচে থাকার প্রতীক।
মাতামুহুরীর তীরে গড়ে উঠেছে মারমা, মুরুং, ত্রিপুরাসহ নানা পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জনপদ। তাদের ভাষা, লোককথা, কৃষিজীবন ও আচার-অনুশীলনের ভেতর দিয়ে এই নদী প্রবাহিত হয়েছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। একসময় ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসনের নজরে পড়ে এই নদী হয়ে ওঠে প্রশাসনিক ও বননীতির অংশ; ক্যাপ্টেন টি. এইচ. লুইনের বিবরণে মাতামুহুরী স্থান পায় ইতিহাসের দলিলে। আবার রাষ্ট্রীয় বন উজাড়, অপরিকল্পিত উন্নয়ন ও পরিবেশগত অবহেলায় আজ এই নদী দাঁড়িয়ে আছে অস্তিত্ব সংকটের মুখে।
স্মৃতি ও বাস্তবতা, ইতিহাস ও বর্তমান, সৌন্দর্য ও সংকট—সবকিছুর সমান্তরাল স্রোত বয়ে চলে মাতামুহুরীতে। এই নদীকে বুঝতে হলে তাকে কেবল চোখে নয়, হৃদয়ে দেখতে হয়। কারণ মাতামুহুরী কোনো সাধারণ নদী নয়—এ এক জনপদের আত্মা, পাহাড়ের নিঃশ্বাস এবং মানুষের নীরব সহযাত্রী।
মাতামুহুরী নদী কেবল জলপ্রবাহ নয়—এ এক দীর্ঘ ইতিহাসের ধারক। পাহাড়, বন, মানুষ ও রাষ্ট্র—সবাই এখানে একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে স্মৃতি ও সংঘাতের অদৃশ্য স্রোতে। এই নদীকে বুঝতে হলে তাকে দেখতে হবে উপনিবেশের চোখে, বননীতির দলিলে, পাহাড়ি মানুষের জীবনযাত্রায় এবং আজকের শুষ্ক বাস্তবতায়।
উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসন যখন পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলে, তখন মাতামুহুরী নদী তাদের নজরে আসে একটি প্রাকৃতিক করিডোর হিসেবে। পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথম জেলা প্রশাসক Captain T. H. Lewin তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ The Hill Tracts of Chittagong and the Dwellers Therein (১৮৬৯)-এ মাতামুহুরীকে উল্লেখ করেছেন Muri Khyang বা Morai Khyang নামে।
লুইনের বর্ণনায় মাতামুহুরী—
তবে তিনি একথাও স্বীকার করেন—নদীর উপরের অংশ, বিশেষত উৎসমুখসংলগ্ন পাহাড়ি উপনদীগুলোতে রয়েছে অবিমিশ্র সৌন্দর্য। এই সৌন্দর্যই ছিল উপনিবেশিক শাসকদের আগ্রহের কেন্দ্র—কারণ বন মানে সম্পদ, আর নদী মানে পরিবহন।
১৮৮০ সালের ১৭ নভেম্বর ব্রিটিশ সরকার প্রায় ১ লক্ষ ৩ হাজার একর পাহাড়ি এলাকা নিয়ে ঘোষণা করে Mata Muhuri Reserve Forest। কথিত উদ্দেশ্য ছিল—
কিন্তু বাস্তবে এই বননীতি ছিল কাগুজে। বন সংরক্ষণের নামে আইন হলেও বন রক্ষা যায়নি। জুমচাষ বন্ধ করতে না পারায় নিবিড় ঘনবনও তৈরী হয়নি। প্রাকৃতিক সৃষ্ঠ বন যা ছিলো তাও রক্ষা করা যায়নি। বন রক্ষা করা হলো কাগজে, কিন্তু মানুষের সঙ্গে বনের সম্পর্ক ছিন্ন করা হলো বাস্তবে।
দুঃখজনক সত্য হলো—যে বন একদিন মাতামুহুরীর প্রাণ ছিল, সেই বনই আজ প্রায় নিশ্চিহ্ন। বিশেষত ১৯৯৭ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত সময়কে স্থানীয়রা বলেন বন নিধনের কালো অধ্যায়। এই সময়—
মিলে রিজার্ভ ফরেস্টকে পরিণত করে এক প্রকার উজাড় প্রান্তরে। বর্তমানে এই রিজার্ভে প্রকৃত বনভূমির পরিমাণ ১০ শতাংশেরও কম বলে ধারণা করা হয়।
এর প্রত্যক্ষ ফল পড়েছে মাতামুহুরীর ওপর—
নদী যেন ধীরে ধীরে নিজের অস্তিত্ব হারাচ্ছে।
একসময় মাতামুহুরীর উজানে দেখা মিলত নদী টিটি, মেঘ হও মাছরাঙা, নানা প্রজাতির বানর ও জলচর পাখির। আজ সেসব স্মৃতি মাত্র। এবারের যাত্রায় উৎসমুখ থেকে মোহনা—কোথাও কোনো পাখির দেখা না পাওয়া কেবল কাকতাল নয়; এটি এক গভীর পরিবেশগত সংকেত।
প্রকৃতি যখন নীরব হয়, তখন সেটাই সবচেয়ে ভয়ংকর ভাষা।
আজ মাতামুহুরী দাঁড়িয়ে আছে এক সন্ধিক্ষণে—
যদি—
তবে মাতামুহুরী কেবল একটি নাম হয়ে থাকবে, প্রবাহ নয়।
মাতামুহুরী আমাদের শুধু ভ্রমণের আনন্দ দেয় না; সে আমাদের প্রশ্ন করে—
আমরা কি প্রকৃতির উত্তরাধিকারী, নাকি কেবল ভোগদখলদার?
এই নদীকে বাঁচানো মানে—
মাতামুহুরী আজো বয়ে চলে।
প্রশ্ন হলো—আমরা কি তার পাশে আছি, নাকি তার বিপরীতে?
আপনার মতামত লিখুন :