
পবিত্র কুরআনুল কারিমের সূরা আত-তাওবার ৬৫-৬৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ্ তা’আলা মুনাফিকদের একটি মারাত্মক আচরণ সম্পর্কে চূড়ান্ত ফয়সালা দিয়েছেন। আয়াতটি হলো: “যদি তুমি তাদের জিজ্ঞেস কর, তারা অবশ্যই বলবে, ‘আমরা তো কেবল আলাপ-আলোচনা ও কৌতুক করছিলাম।’ বলো, ‘তোমরা কি আল্লাহ, তাঁর আয়াতসমূহ ও তাঁর রাসূলকে নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করছিলে? অজুহাত পেশ করো না, তোমরা ঈমান আনার পর কুফরি করেছ।” (সূরা আত-তাওবা: ৬৫-৬৬)
এই আয়াতটি একটি সতর্কবাণী। ইসলামের প্রথমযুগেও বাউল আবুল সরকারের মতো নামধারী মুসলমান ছিলো। এইসব মুনাফিকসহ এবং পুরো মানবজাতীর জন্য এই আয়াতে সতর্কতার পাশাপাশি অনেক শিক্ষা লুকিয়ে আছে। আয়াতটি যুগে যুগে সেই সমস্ত মানুষের জন্য একটি সতর্কবাণী, যারা আল্লাহ্, তাঁর দীন বা রাসূলের প্রতি সামান্যতম অশ্রদ্ধা প্রদর্শন করে। সম্প্রতি বাউল আবুল সরকারের বিরুদ্ধে মহান রবের শানে সুস্পষ্ট বেয়াদবি ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ মন্তব্যের যে অভিযোগ উঠেছে এবং যা নিয়ে দেশব্যাপী তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে, সেই ঘটনাটি এই কুরআনি নির্দেশনার আলোকে বিশ্লেষণ করা অপরিহার্য।
বাউল আবুলের ‘কৌতুক’ ও ‘বেয়াদবি’: বাংলাদেশের সমাজ ও সংস্কৃতির প্রেক্ষাপটে, ধর্মীয় বা আধ্যাত্মিক আলোচনার নামে অনেক সময়ই এমন বক্তব্য উঠে আসে, যা ইসলামের মৌলিক আকিদা ও আস্থার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বাউল আবুল সরকারের ক্ষেত্রে অভিযোগ উঠেছে যে, তিনি আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার প্রতি সরাসরি বেয়াদবিমূলক ভাষা ব্যবহার করেছেন। তার এই বেয়াদবীর ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পরও রাজনীতির কতগুলো কীট বাউলদের ওপর হামলার অজুহাতে মায়াকান্না শুরু করেছেন। অথচ একটিবারও মহান আল্লাহর শানে বাউল আবুলের বেয়াদবী নিয়ে কোনো কথা বলেননি তারা।
অনেকে আবার বাউল আবুলের চিন্তাধারাকে ইসলামী সুফিবাদের সাথে তুলনা করে পক্ষ নিতে দেখা যাচ্ছে। অথচ ইসলামী সুফিবাদ হলো- আধ্যাত্মিকতার সূক্ষ্ম দীপশিখা, হৃদয়ের পথের সরলতা, ভালোবাসার গোপন ভাষা আর মানুষের সঙ্গে আল্লাহর আত্মিক মিলনের অভ্যন্তরীণ অভিযান। এ এক অদৃশ্য কিন্তু গভীর যাত্রা- যেখানে পথিক বদলায় ধীরে ধীরে, কিন্তু হৃদয় বদলায় চিরতরে। মুসলমান বাউল আবুলের হৃদয় আল্লাহর শানে বদলায়নি বরং বিগড়ে গেছে। আল্লাহকে নিয়ে তার বিদ্রুপ সেটাই প্রমাণ করে।
অভিযুক্ত বাউল আবুল এবং তার পক্ষাবলম্বনকারীরা প্রায়শই এমন কাজের সমর্থনে দুটি প্রধান অজুহাত পেশ করেন:
১. নিছক ‘আলাপ-আলোচনা ও কৌতুক’: তারা বলেন, এটি লোকগানের একটি ধারা, যা নিছক গান বা মজলিসের আলাপ-আলোচনা ছিল এবং এর পেছনে কারও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার কোনো গুরুতর উদ্দেশ্য ছিল না।
২. আধ্যাত্মিক ‘মারিফতি’ ব্যাখ্যা: কেউ কেউ দাবি করেন যে, এসব গান বা আলোচনাকে শাব্দিক অর্থে না নিয়ে এর আধ্যাত্মিক বা মারিফতি তাৎপর্য অনুধাবন করা উচিত।
এই দুটি অজুহাতই সূরা আত-তাওবার ৬৫-৬৬ আয়াতের সরাসরি বিপরীতে অবস্থান করে।
কুরআনের আয়াতের নির্দেশনায় যুক্তির খণ্ডন:
যারা বাউল আবুল সরকারের আচরণের পক্ষ নিচ্ছেন, তাদের অবস্থান কেন সঠিক নয়, তা কুরআনের সুস্পষ্ট নির্দেশনার আলোকে যুক্তি দিয়ে সহজেই বোঝা যায়:
১. ‘কৌতুক’ কোনো অজুহাত নয়: মুনাফিকরাও রসূল (সাঃ) এবং তাঁর সাহাবীদের নিয়ে উপহাস করে দাবি করেছিল, “আমরা তো কেবল আলাপ-আলোচনা ও কৌতুক করছিলাম।” কিন্তু আল্লাহ্ তাদের এই অজুহাতকে তীব্রভাবে প্রত্যাখ্যান করে সরাসরি জিজ্ঞাসা করেছেন: “তোমরা কি আল্লাহ, তাঁর আয়াতসমূহ ও তাঁর রাসূলকে নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করছিলে?”
কুরআনের এই আয়াতের তাফসির বহু তাফসীরগ্রন্থে বিশদভাবে আলোচনা করা হয়েছে। তবে এই আয়াতের নিরিখে আমরা যে শিক্ষা পাই তা হচ্ছে- আল্লাহ্ তা’আলা স্পষ্ট করেছেন যে, আল্লাহ্ বা তাঁর দীন সংক্রান্ত বিষয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ বা বেয়াদবি কোনোভাবেই ‘নিছক কৌতুক’ বলে ছাড় পেতে পারে না। যখন আল্লাহ্, তাঁর ক্ষমতা, তাঁর বিধান বা তাঁর রাসূলের প্রতি অসম্মান দেখানো হয়, তখন তা আর সাধারণ কৌতুক থাকে না; এটি ঈমানের গণ্ডি অতিক্রম করে যায়।
২. ঈমান ও কুফরির সীমারেখা: আয়াতের শেষাংশ চূড়ান্ত ফয়সালা দিয়েছে: “অজুহাত পেশ করো না, তোমরা ঈমান আনার পর কুফরি করেছ।”
এই আয়াতাংশটি প্রমাণ করে যে, মুখে ঈমানের দাবি থাকলেও, যদি কেউ আল্লাহ্, তাঁর আয়াত বা রাসূলের শানে বেয়াদবি করে, তবে সেই কাজ তাকে ঈমান থেকে বের করে কুফরির পর্যায়ে নিয়ে যায়। এটি প্রমাণ করে, ঈমান শুধু অন্তরের বিশ্বাস নয়; এটি কথা, কাজ ও আচরণের মাধ্যমে আল্লাহ্ ও তাঁর দীনের প্রতি পরিপূর্ণ সম্মান ও আনুগত্য দাবি করে।
যেসব তথাকথিত মুসলমান এবং ঈমানের দাবীতে যাদের হৃদয় অন্তসারশূণ্য তারাই বাউল আবুলের পক্ষ নিচ্ছেন। তারা হয়তো আন্তরিকভাবেই তার সুর বা শিল্পকেই সমর্থন করছেন। কিন্তু তাদের বোঝা উচিত, শিল্প বা মারিফতি ব্যাখ্যার নামে এমন উক্তি করা, যা আল্লাহ্ তা’আলার শানে সরাসরি বেয়াদবি—তা কোনোভাবেই ইসলামী সীমারেখার মধ্যে পড়ে না। এই কাজ স্বয়ং কুরআনের নির্দেশনা অনুযায়ী সুস্পষ্ট কুফরি হিসেবে গণ্য।
৩. মারিফতি ব্যাখ্যার নামে বেয়াদবি অগ্রহণযোগ্য: ইসলামের আধ্যাত্মিক (মারিফতি) বা সুফি ধারা কখনোই আল্লাহ্ বা রাসূলের শানে বেয়াদবিকে সমর্থন করে না। সুফিগণ আল্লাহ্ ও রাসূলের প্রতি চরম ভক্তি ও আদব (সম্মান) বজায় রেখেই আধ্যাত্মিক জ্ঞান অন্বেষণ করেন। কোনো উক্তি যদি আল্লাহ্ তা’আলার অতুলনীয় মর্যাদা, ক্ষমতা বা এককত্বকে সরাসরি আঘাত করে, তবে তা কোনো আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যার নামেও জায়েয হতে পারে না।
সুফিবাদ (তাসাউফ) বা মারেফাত ইসলামের আধ্যাত্মিক ধারা হিসেবে পরিচিত। তা কেবল ধর্মীয় অনুশাসন পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি হলো আল্লাহর প্রতি প্রেম, নৈকট্য এবং আত্মার পরিশুদ্ধির এক গভীর ও রহস্যময় পথ। এটি ইসলামের সেই অন্তঃস্থ প্রবাহ, যা শুষ্ক যুক্তি বা বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতার ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের হৃদয়কে সরাসরি স্রষ্টার ঐশী প্রেমের সমুদ্রে ডুবিয়ে দিতে চায়।
বাউলীপনার নামে ইসলামের সুফিবাদকে অনেকে গুলিয়ে ফেলেন। মারেফাত শব্দটি এসেছে ‘আরিফা’ (জানা) ধাতু থেকে, যার অর্থ হলো গভীর জ্ঞান বা অন্তর্দৃষ্টি দ্বারা আল্লাহকে জানা ও উপলব্ধি করা। সুফিদের মতে, শরীয়তের বিধি-বিধান হলো দেহের কাঠামো, আর মারেফাত হলো সেই কাঠামোর প্রাণ। সুফিবাদ বিশ্বাস করে, মানুষের আত্মা আল্লাহ থেকে বিচ্যুত এক কণা, যা স্বস্থানে ফিরতে ব্যাকুল। এই বিচ্ছেদ দূর করে আল্লাহর সঙ্গে ফানা (আত্মবিলীন) বা প্রেমময় নৈকট্য অর্জনের প্রক্রিয়াই হলো মারেফাত।
সুফিগণ বিশ্বাস করেন- আল্লাহকে পাওয়া যায় বাহিরের চোখে নয়, অন্তরের নীরবে; কোরআন শুধু পড়ার জন্য নয়, হৃদয়ে বয়ে বেড়ানোর জন্য; নামাজ শুধু বাঁধাধরা রীতি নয়, আত্মার নিশ্বাস। এই ধারার মানুষেরা দুনিয়ার চাকচিক্যকে পাতলা কুয়াশা মনে করেন- যা সূর্যের প্রথম আলোয় মিলিয়ে যায়। মানুষের ভেতরে যে নিষ্কলুষ শিশুটি লুকিয়ে আছে, তাকে জাগ্রত করাই তাদের সাধনা। সেই সাধনার নাম মুজাহাদা- নিজেকে বদলানোর আকুতি; আর মুরাকাবা- আল্লাহর উপস্থিতিকে হৃদয়ের ওপর অনুভব করা।
মুসলমান নামধারী বাউল আবুল সরকারেররা ইসলামী সুফিবাদের এই ধারণার ধারেকাছেও নেই। তাদের মাঝে নেই কুরআনের মূল চেতনার কোনো জ্ঞান। তাদের জ্ঞানটুকু হচ্ছে ইসলাম খোঁচানোর সেই পুরনো কৌশল। তাদের সেই কৌশলকে জিইয়ে রাখতে আমাদের দেশের মূলধারার বামপন্থী ও মধ্যপন্থী রাজনৈতিক দলের নেতারাও আবার সক্রিয়। যা বাউল সরকারের গ্রেফতারের পর তাদের মুখোশ খসে পড়তে শুরু করেছে।
বাউল আবুলের এই ঘটনাটি আমাদের সমাজের জন্য একটি কঠিন পরীক্ষা। এই কুরআনি আয়াত আমাদের শেখায় যে, আল্লাহ্, তাঁর রাসূল এবং তাঁর দীন হলো সর্বোচ্চ সম্মানের স্থান। কৌতুক বা আধ্যাত্মিকতার নামে এই সীমাকে অতিক্রম করা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য এবং তা ঈমানের জন্য মারাত্মক হুমকি স্বরূপ। যারা এই আচরণের পক্ষ নিচ্ছেন, তাদের উচিত কুরআনের এই আয়াতের নির্দেশনার আলোকে নিজেদের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করা এবং বোঝা যে, আল্লাহ্র শানে বেয়াদবি কোনো শৈল্পিক স্বাধীনতা বা সামান্য ত্রুটি নয়, বরং ঈমান থেকে কুফরির দিকে ধাবিত হওয়ার চূড়ান্ত পরিণতি।
লেখক: সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান পার্বত্য জেলা।
মোবাইল: 01556-560126 / 01645-950296
তারিখ: 28/11/2025
আপনার মতামত লিখুন :