ধর্ম ও বিজ্ঞান: বার্ট্রান্ড রাসেল বনাম কাজী নজরুল ইসলাম


Momtaj Uddin Ahamad প্রকাশের সময় : নভেম্বর ২৪, ২০২৫, ৩:২৩ অপরাহ্ন /
ধর্ম ও বিজ্ঞান: বার্ট্রান্ড রাসেল বনাম কাজী নজরুল ইসলাম

।। মমতাজ উদ্দিন আহমদ ।।


ধর্ম ও বিজ্ঞান। মানবসভ্যতার দুটি মৌলিক জ্ঞানক্ষেত্র। বিশ্বদর্শনের দুটি স্বতন্ত্র ধারার প্রতিনিধিত্ব করে। একদিকে বার্ট্রান্ড রাসেল যুক্তিবাদ, বিজ্ঞানমনস্কতা ও সন্দেহবাদের আলোকে ধর্মের সমালোচনাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছেন। অন্যদিকে বাঙালি মুসলিম নবজাগরণের কবি কাজী নজরুল ইসলাম ধর্মকে মানবতার শক্তি, মুক্তি ও নৈতিকতার উৎস হিসেবে পুনর্নির্মাণের চেষ্টা করেছেন।

ধর্মের ব্যাপারে রাসেল ছিলে সংশয়বাদী/নাস্তিক। তিনি ধর্মের ঐশী কর্তৃত্বকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন এবং ধর্মীয় বিশ্বাসকে কুসংস্কার, ভয় ও মানসিক সান্ত্বনার ফল হিসেবে দেখেন। অপরদিকে, আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন অসাম্প্রদায়িক ও উদার ধর্মবাদী। তিনি ইসলামের মূল আদর্শে বিশ্বাসী হলেও ধর্মীয় গোঁড়ামি, কূপমণ্ডূকতা ও অন্ধবিশ্বাসকে তীব্রভাবে আক্রমণ করেন।

জ্ঞানের ভিত্তিও ছিলো দুজনের কাছে দু’রকম। নজরুলের কাছে প্রেম, আধ্যাত্মিকতা ও মানবতা জ্ঞানরাজ্যে মুখ্য উপাদান। তাঁর কাছে ধর্ম হলো আত্মার মুক্তি ও ভালোবাসার পথ, যা যুক্তি দিয়ে সম্পূর্ণ পরিমাপ করা যায় না। অপদিকে, রাসেলে কাছে জ্ঞান ছিলো ছিলো পরীক্ষা, পর্যবেক্ষণ ও যুক্তি। তিনি মনে করেন, সত্যের একমাত্র নির্ভরযোগ্য উৎস হলো বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি।

এই নিবন্ধে রাসেল ও নজরুলের ধর্ম-বিজ্ঞান সম্পর্কিত ধারণাসমূহকে তুলনামূলকভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। নিবন্ধে প্রতিপন্ন করা হয়েছে যে, রাসেল ধর্মকে জ্ঞানতাত্ত্বিক প্রতিবন্ধকতা হিসেবে প্রত্যাখ্যান করলেও নজরুল ধর্মকে মুক্তির নৈতিক-আলোকিত শক্তি হিসেবে গ্রহণ করেন। দুজনের অবস্থান পরস্পরবিরোধী হলেও উভয়ের অভিমুখই মানবমুক্তি, যুক্তি, ন্যায় ও সত্যের সন্ধানের দিকে নিবদ্ধ।

এই নিবন্ধে বার্ট্রান্ড রাসেল এবং কাজী নজরুল ইসলামের চেতনায় ধর্ম, বিজ্ঞান, যুক্তিবাদ, সন্দেহবাদ, মানবধর্ম, আধুনিকতা, প্রগতিশীলতার ওপর আলোকপাত করা হবে।

ধর্ম ও বিজ্ঞান—এই দুইয়ের সম্পর্ক মানব চিন্তার ইতিহাসে অনন্তকাল ধরে বিতর্কিত। আধুনিক যুগে বিজ্ঞান যেমন মানুষের জ্ঞানতাত্ত্বিক কাঠামো পুনর্গঠিত করেছে, তেমনি ধর্ম মানুষের নৈতিক-মানসিক কাঠামোকে দীর্ঘকাল ধরে নির্দেশনা দিয়েছে। পশ্চিমে আলোকায়ন-পরবর্তী যুগে ধর্ম ও বিজ্ঞানের দ্বন্দ্ব আলোচনাকে প্রকট করে তোলে। একইদিকে উপনিবেশিক পূর্ববাংলায় মানবমুক্তি, সামাজিক সংস্কার ও প্রগতির দাবি নিয়ে নজরুল ধর্মকে পুনর্গঠন করেন মানবতার শক্তি হিসেবে।

এ প্রেক্ষাপটে বার্ট্রান্ড রাসেল ও কাজী নজরুল ইসলাম—দুই ভিন্ন সভ্যতা ও বৌদ্ধিক জগতের প্রতিনিধি—ধর্ম ও বিজ্ঞানের সম্পর্ক নিয়ে কীভাবে ভাবলেন, কেন ভাবলেন, এবং তাদের ধারণা আজকের যুগে কতটা প্রাসঙ্গিক—তা এই নিবন্ধের প্রধান আলোচ্য।

তাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে পশ্চিমের আধুনিকতা ও রাসেলের যুক্তিবাদ নিয়ে পর্যালোচনায় দেখা যায়, বার্ট্রান্ড রাসেল (১৮৭২–১৯৭০) ইউরোপীয় আলোকায়ন, বিজ্ঞানবিপ্লব ও লজিক্যাল পজিটিভিজমের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছেন। এরফলে ধর্ম সম্পর্কে তার অবস্থান- ইন্দ্রিয়নির্ভর প্রমাণ নেই এমন কোনো দাবিকে তিনি সত্য বলে গ্রহণ করেননি। ধর্মকে তিনি মূলত ভয়, অজ্ঞতা ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণের ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। বিজ্ঞানকে তিনি মানবজ্ঞান অর্জনের একমাত্র নির্ভরযোগ্য পথ মনে করেন। নৈতিকতার উৎস হিসেবে ধর্ম নয়, বরং মানবিক অনুভূতি ও যুক্তিবাদকে গুরুত্ব দিয়েছেন।

তার বিখ্যাত বক্তব্য, “Religion is something left over from the infancy of our intelligence.”—তার দর্শনের সার হিসেবে বিবেচ্য।

অপরদিকে, উপনিবেশিক বাংলায় নজরুলের ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ পর্যালোচনায় দেখা যায়, কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯–১৯৭৬) এমন এক সময় জন্মগ্রহণ করেন, যখন এই উপমহাদেশে উপনিবেশিক দমন, সাম্প্রদায়িক বিভাজন, মুসলিম সমাজের পশ্চাৎপদতা, জাতীয়তাবাদ ও মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষা- সব একসঙ্গে উপস্থিত।

তাই নজরুলমানসে ধর্মভাব ফুটে উঠেছে- ধর্ম মানবমুক্তির শক্তি, বিভেদের নয়। বিজ্ঞান আধুনিকতার পথ, ধর্ম নৈতিকতার আলো। আল্লাহর অস্তিত্বের মধ্যে তিনি বৈজ্ঞানিক বিস্ময়, সৃষ্টির রহস্য ও মানবসমতার নীতি খুঁজে পান। অন্যায়, কুসংস্কার, মৌলবাদ ও ধর্মীয় একচেটিয়াত্বের বিরুদ্ধে তার অবস্থান খুবই দৃঢ়। তার মানবধর্ম তাই বৈজ্ঞানিক যুক্তি ও আধ্যাত্মিক মানবতার এক সংমিশ্রণ।

ধর্মের জ্ঞানতাত্ত্বিক সমালোচনায় রাসেলে অবস্থান পর্যালোচনায় দেখা যায়, তিনটি স্তম্ভের ওপর রাসেলের যুক্তি দাঁড়ানো। এরমধ্যে রয়েছে একটি হচ্ছে ধর্ম সত্য নয়, প্রমাণহীন। রাসেল মনে করেন: ধর্মের কোনো দাবি ইন্দ্রিয়-ভিত্তিক বা পরীক্ষাপদ্ধতিতে সত্য প্রমাণ করা যায় না। সুতরাং ধর্ম জ্ঞান নয়, বিশ্বাস। বিজ্ঞানের সত্য পরিবর্তনশীল কিন্তু যাচাইযোগ্য; ধর্মের সত্য স্থির কিন্তু অযাচাইযোগ্য।

তার দ্বিতীয় যুক্তি ধর্ম ভয়-নির্ভর এবং সামাজিক নিয়ন্ত্রণের উপকরণ। রাসেলের দৃষ্টিতে- মানুষ মৃত্যুভয়, মহাবিশ্বের রহস্য এবং অনিশ্চয়তা থেকে বাঁচতে আল্লাহকে কল্পনা করেছে। রাষ্ট্র ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান মানুষকে বশীভূত রাখতে ধর্মকে ব্যবহার করেছে।

রাসেলের তৃতীয় যুক্তি হচ্ছে- নৈতিকতার উৎস ধর্ম নয়। রাসেল বিশ্বাস করতেন- নৈতিকতা মানুষের সামাজিক-সহানুভূতিজাত প্রবণতা, ধর্মের দান নয়। মানবিকতাই নৈতিকতার প্রধান ভিত্তি।

ধর্মের নৈতিক-মানবিক পুনর্নির্মাণের নজরুল: রাসেলের বিপরীতে নজরুল ধর্মকে প্রত্যাখ্যান করেন না; বরং নতুনভাবে ব্যাখ্যা করেন। নজরুলমানসে শিশুকাল থেকে ধর্মের অনুসরণ ও অনুকরণ লক্ষণীয়। নজরুলের দৃষ্টিতে ধর্ম মানবতার জন্য। নজরুল ঘোষণা করেন:
“ধর্মের মূল কথা—মানবধর্ম।” ধর্ম মানুষের ন্যায়, সমতা ও প্রেমের চর্চা নিশ্চিত করার পথ। ধর্ম বিভেদ সৃষ্টি করলে তা ধর্ম নয়। নজরুল মনে করতেন বিজ্ঞান ও যুক্তি—ধর্মের শত্রু নয়। নজরুল আধুনিক বিজ্ঞানকে অস্বীকার করেননি; বরং বলেন— জ্ঞানই মানবজীবনের আলো। বিজ্ঞান মানুষের সৃষ্টিশীলতার বিস্তার। ধর্ম মানুষকে নৈতিকভাবে প্রস্তুত করে।

মৌলবাদ ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে নজরুলের তীব্র অবস্থানও লক্ষণীয়। নজরুল সমগ্র জীবনে যে বিষয়গুলোর বিরোধিতা করেছেন- ধর্মীয় কুসংস্কার, সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মের নামে আধিপত্য, বৈষম্য ও নারীর অধিকারহরণ। নজরুলের চোখে সত্যিকারের ধর্ম মানবমুক্তির আন্দোলন।

রাসেল ও নজরুলের জীবন প্রবাহে ধর্ম ও বিজ্ঞানের প্রতি তাদের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় ধর্মের প্রতি রাসেলের অবস্থান ‘ধর্মের সত্য-মূল্য অস্বীকার; বৈজ্ঞানিক যুক্তি চাই।’। পক্ষান্তরে ধর্মের প্রতি নজরুলের অবস্থান হচ্ছে- ধর্ম মানুষকে নৈতিক-মানবতাবাদী আলোকে পুনর্গঠন করে।

রাসেলে দৃষ্টিতে বিজ্ঞানই একমাত্র জ্ঞানব্যবস্থা। অপরদিকে, নজরুলের দৃষ্টিতে বিজ্ঞান অগ্রগতির পথ, ধর্ম নৈতিকতার পথ।

মানুষ ও সমাজবোধ নিয়ে রাসেলের অবস্থান হচ্ছে ব্যক্তিকেন্দ্রিক যুক্তি, বিশ্বনাগরিক মানবতা। অপরদিকে নজরুলকে আমরা সংগ্রামী মানবতা, নিপীড়িত মানুষের পক্ষে অবস্থান নিতে দেখি। এক্ষেত্রে দুজনের পথ ভিন্ন হলেও লক্ষ একই। আর তা হচ্ছে- মানুষের মুক্তি, সত্য ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা, অন্ধবিশ্বাসের বিরুদ্ধে অবস্থান ও মানবমর্যাদার মূল্যায়ন।

যদিও রাসেলের ধর্মবিমুখ যুক্তিবাদ ও নজরুলের মানবতাবাদী ধর্মভাব একে অপরের বিরোধী বলে মনে হয়, আসলে উভয়েই প্রতিষ্ঠা করতে চান যুক্তি, সত্য, ন্যায়, শোষণমুক্ত সমাজ ও বৈষম্যহীন মানবসম্প্রদায়।

পার্থক্যটি পদ্ধতিগত- রাসেল ধর্মকে বর্জন করে মুক্তির পথ দেখান। নজরুল ধর্মকে শুদ্ধ করে মুক্তির পথ দেখান। এই দুই কাঠামো মিলিয়ে দেখলে আধুনিক মানুষ ধর্ম ও বিজ্ঞানের সম্পর্ক নিয়ে আরও সমন্বিত ও সমৃদ্ধ বোধ তৈরি করতে পারে।

বার্ট্রান্ড রাসেল ও কাজী নজরুল ইসলাম-দুজন দুই সাংস্কৃতিক জগতের প্রতিনিধি হলেও মানবতার প্রশ্নে তাদের আদর্শ এক জায়গায় এসে মিলিত হয়। রাসেল যেখানে বলেন—“চিন্তা করো, প্রমাণ খুঁজো”। নজরুল সেখানে বলেন—“মানুষ হও, ন্যায়কে ভালোবাসো।”

ধর্ম ও বিজ্ঞানকে তারা ভিন্নভাবে বিচার করলেও উভয়ের লক্ষ্য একই: সত্য, যুক্তি, স্বাধীনতা এবং মানবমর্যাদার প্রতিষ্ঠা। আধুনিক বিশ্বে ধর্মীয় চরমপন্থা ও বৈজ্ঞানিক অবমাননার দ্বন্দ্বের সময় এই দুই বুদ্ধিজীবীর ভাবনা আমাদের নতুন পথ দেখাতে পারে।

সংক্ষেপে, বার্ট্রান্ড রাসেল ধর্ম ও বিজ্ঞানকে দ্বান্দ্বিক অবস্থানে রেখে ধর্মের আনুষ্ঠানিক বিলোপ চেয়েছেন, আর কাজী নজরুল ইসলাম এই দুইকে সহাবস্থানের সুযোগ দিয়ে ধর্মের অভ্যন্তরীণ প্রেম ও মুক্তিসাধনাকে বিজ্ঞান ও মানবতার সঙ্গে যুক্ত করতে চেয়েছেন। নজরুলের দর্শন ছিল সমন্বয় আর রাসেলের দর্শন ছিল বিশ্লেষণ।

লেখক: সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান পার্বত্য জেলা।