
মমতাজ উদ্দিন আহমদ
স্বাধীন বাংলাদেশের ভূখণ্ডে পার্বত্য চট্টগ্রাম এক ভিন্ন রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক বাস্তবতা বহন করে। একসময় এটি ছিল জেএসএস এর আত্মপরিচয় ও ন্যায্য অধিকার আদায়ের এক ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের দাবী, যা পাহাড়ি জনগণের স্বতন্ত্র জাতিসত্তা রক্ষার কথা প্রচার করতো তারা। কিন্তু আজ সেই রাজনীতি পাহাড়ি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দ্বারাই এক গভীর নৈতিক ও আত্মবিভাজনের সংকটে নিমজ্জিত। এই সংকটের পেছনে যেমন আঞ্চলিক রাজনীতির আদর্শিক স্খলন দায়ী, তেমনি দায়ী যারা পাহাড়ের বিভাজনকে দীর্ঘায়িত করতে ইন্ধন জুগিয়েছে।
ঐক্য ভেঙে প্রভাব ও অর্থের প্রতিযোগিতা:
পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর একাংশের কাছে পার্বত্য রাজনীতির ইতিহাসে এম এন লারমা ছিলেন সেই আলোকবর্তিকা, যিনি পাহাড়ি জাতিসত্তার প্রশ্নকে রাষ্ট্রীয় আলোচনার কেন্দ্রে এনেছিলেন। কিন্তু তাঁর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই এই রাজনীতি তার আদর্শিক ভিত্তি হারাতে শুরু করে। লারমার হত্যাকাণ্ডের সত্য গোপন করার যে রাজনীতি শুরু হয়েছিল, তা আজ এক কালো অধ্যায়ে পরিণত হয়েছে।
পাহাড়ি জনগণের এক সময়ের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন আজ অসংখ্য উপদলে বিভক্ত। নেতৃত্বের লড়াই, পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং দলীয় আধিপত্যের দ্বন্দ্ব—এই সবই পাহাড়ি রাজনীতিকে ভিতর থেকে দুর্বল করে দিয়েছে। তাদের তথাকথিত মুক্তির রাজনীতি রূপ নিয়েছে প্রভাব, অর্থ এবং ক্ষমতার প্রতিযোগিতায়। দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, একই স্বপ্নের মানুষরাই আজ একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী, আর তৃণমূলের কণ্ঠস্বর চাপা পড়ে যাচ্ছে ক্ষমতা দখলের কৌশলে। এই আত্মবিভাজনের সুযোগ রাষ্ট্রব্যবস্থার অপকৌশলকারীরাও পূর্ণ মাত্রায় ব্যবহার করছে।
ইতিহাস গোপনের নৈতিক ব্যর্থতা: লারমা-উত্তর রাজনীতি:
লারমা হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ, ঘটনার বিশ্লেষণ বা দোষীদের বিষয়ে আজও কোনো স্বচ্ছ বক্তব্য পাওয়া যায় না। এটি কেবল ইতিহাসের নীরবতা নয়, এটি এক গভীর নৈতিক ব্যর্থতাও। যে রাজনীতি তার নিজের ইতিহাসের সত্যকে আড়াল করে, তা জনগণের সম্পত্তি না থেকে কিছু সুবিধাভোগীর সম্পত্তিতে পরিণত হয়। সবুজাভ পাহাড়ের শান্ত কোলে স্বাধীনতা পরবর্তীকাল থেকে যে আঞ্চলিক আধিবাদ্যবাদী রাজনীতির সূচনা হয়েছিল তার শেষ কোথায় কেউ তা জানে না।
আজ যে সব সংগঠন এম এন লারমার নামে ব্যয়বহুল জন্ম ও মৃত্যুদিবস পালন করে, তারাই তাঁর হত্যার বিচার বা সত্য উদঘাটনের দাবি তোলার সময় অদ্ভুতভাবে নীরব। এটি আদর্শিক উত্তরাধিকারের প্রতি দায়বদ্ধতা নয়, বরং চেতনার ব্যবসা—যা পাহাড়ি রাজনীতির সততাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এই নীরবতা প্রকারান্তরে সেইসব রাষ্ট্রযন্ত্রের অপকৌশলকারীদের সুবিধা করে দিচ্ছে, যারা চায় এই বিতর্ক চলুক এবং ঐক্য ফিরে না আসুক।
শান্তিচুক্তির পর গণতান্ত্রিক চেতনার বিনাশ:
১৯৯৭ সালের শান্তিচুক্তি পার্বত্য জনগণের দীর্ঘদিনের সংগ্রামের ফসল। যদিও পার্বত্য বাঙ্গালী জনগোষ্ঠী এবং দেশের নিরপেক্ষ সচেতন নাগরিকদের অভিযোগ ও দাবী এই শান্তিচুক্তির অনেক ধারা সংবিধাবিরোধী। তারপরও আশা ছিল, এই চুক্তির পর পার্বত্য রাজনীতি গণমানুষের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করবে। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে উল্টোটা। শান্তিচুক্তি পরবর্তী রাজনীতি গণমানুষের চেয়ে বেশি কেন্দ্রীভূত হয়েছে হাতেগোনা কিছু নেতৃত্বের কাছে। আবার তা মূলধারার রাজনীতির সাথে যুক্ত ক্ষমতাশালীদের কাছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ও পার্বত্য জেলা পরিষদগুলোতে গেলে বুঝা যায় পার্বত্য বাঙ্গালীরা কোথায় বসবাস করছেন। তাদের অবস্থান নাগরিক হিসেবে কোন জায়গায়। মনে পড়ে যায়, জাতীয় কবির সেই কবিতাংশটি- ‘দুনিয়ায় আজি তখ্তে তখ্তে কমবখতের মেলা, শক্তিমাতাল দৈত্যরা সেতা করে চিনিমিনি খেলা।’
পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থানীয় সরকারের বিকেন্দ্রীকরণের বদলে ক্ষমতা সঙ্কুচিত হয়েছে কিছু জাতি গোষ্ঠী, ব্যক্তি ও দলের মধ্যে। পাহাড়ে এখন রাজনীতি মানে আদর্শ নয়, আনুগত্য। মতভেদ মানে বিদ্রোহ, প্রশ্ন মানে শত্রুতা। গণতান্ত্রিক চেতনার বদলে জন্ম নিয়েছে দমননীতি, ভীতি ও অবিশ্বাসের সংস্কৃতি। এই ভয় ও বিভাজনের সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখা রাষ্ট্রীয় এবং স্থানীয় উভয় অংশের কিছু স্বার্থান্বেষী মহলেরই চাওয়া, যাতে গণমানুষের অধিকারের দাবি কখনো শক্তিশালী হতে না পারে। পার্বত্য এলাকায় যাদের জন্ম এবং বর্তমানে পরিণত বয়স তাদের অনেকের মন্তব্য, তারা মরে যাওয়ার পর তাদের প্রজন্মরাও একই ধারার বিভাজনের রাজনীতি দেখেই মরবেন।
পুনর্জাগরণের জন্য আত্মশুদ্ধি ও সত্যের মুখোমুখি হওয়া:
পার্বত্য রাজনীতির সবচেয়ে বড় সংকট হলো আত্মসমালোচনার অভাব। নিজ ইতিহাস পর্যালোচনা না করে এবং ভুল স্বীকার না করে মুক্তির রাজনীতি কখনও টিকতে পারে না। সত্যের মুখোমুখি না হলে এই আত্মবিস্মৃতি কেবল বঞ্চনাকেই দীর্ঘায়িত করবে।
পাহাড়ের এই রাজনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে হলে একটি নতুন রাজনৈতিক নৈতিকতার জন্ম দিতে হবে। এর ভিত্তি হতে হবে:
সংবিধান ও জাতিসত্তা: পার্বত্য চট্টগ্রামে ‘আদিবাসী’ দাবির সাংবিধানিক ভিত্তি:
বাংলাদেশের সংবিধানে দেশের সকল নাগরিকের পরিচয় ও অধিকার স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করা আছে। সংবিধান অনুযায়ী, বাংলাদেশে বসবাসরত সকল নাগরিকই বাঙালি নামে পরিচিত হবেন। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৬(২)-এ বলা হয়েছে, “বাংলাদেশের জনগণ জাতি হিসেবে বাঙালি এবং নাগরিকগণ বাংলাদেশী বলিয়া পরিগণিত হইবেন।” একই সাথে, অনুচ্ছেদ ২৩ক-এ রাষ্ট্র বিভিন্ন উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের অনন্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আঞ্চলিক সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশের ব্যবস্থা গ্রহণের কথা নিশ্চিত করেছে।
এই সাংবিধানিক কাঠামোর বাইরে, পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর কিছু অংশের পক্ষ থেকে যে ‘আদিবাসী’ (Indigenous People) হওয়ার দাবি উত্থাপিত হয়, তার কোনো আইনি বা সাংবিধানিক ভিত্তি নেই। সরকার আন্তর্জাতিক ফোরামেও এ বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট করেছে—বাংলাদেশের ভূখণ্ডে বসবাসকারী সকল ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী বা উপজাতিরা ‘আদিবাসী’ নয়, বরং তারা দেশের উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায় হিসেবে সংবিধান কর্তৃক স্বীকৃত। ‘আদিবাসী’ শব্দটি ব্যবহার করলে তা বাংলাদেশের ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা, সার্বভৌমত্ব ও স্থিতিশীলতা নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে। মূলত, সংবিধানের প্রদত্ত পরিচয়ের প্রতি সম্মান রেখে এবং ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলোর সাংস্কৃতিক অধিকার সংরক্ষণ নিশ্চিত করেই পার্বত্য অঞ্চলে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা আবশ্যক।
পাহাড়ের রাজনীতি এখন এক সংযোগবিন্দুতে দাঁড়িয়ে—হয় পতন, নয় পুনর্জাগরণ। ক্ষমতার নয়, দেশ, নাগরিক অধিকার, সত্য ও আদর্শের জয় নিশ্চিত করেই এই রাজনীতিকে ইতিহাসের সামনে দায়বদ্ধ এবং জনগণের প্রতি সৎ হতে হবে। কারণ, যে রাজনীতি নিজের ইতিহাসের সত্যকে অস্বীকার করে, তার পতন অবশ্যম্ভাবী। সত্যকে চিরকাল গোপন রাখা যায় না।
লেখক: সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান পার্বত্য জেলা।।
আপনার মতামত লিখুন :