
।। মমতাজ উদ্দিন আহমদ ।।
আলীকদম কলেজকে জাতীয়করণ করা শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সরকারি স্বীকৃতি নয়, বরং এটি দেশের দশম বৃহত্তম এবং অত্যন্ত দুর্গম একটি জনপদের প্রায় ৬৫ হাজার মানুষের উচ্চশিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করার একটি সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত।
১. ভৌগোলিক অবস্থান ও বিশাল আয়তনের প্রেক্ষাপটে উচ্চশিক্ষার সহজলভ্যতা
আলীকদম দেশের দশম বৃহত্তম উপজেলা এবং এর প্রায় ৬৫ হাজার জনসংখ্যা অত্যন্ত দুর্গম পাহাড়ী অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। এই জনপদের উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্বাধীনতা পরবর্তীকাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ছিল না। দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে স্থানীয় শিক্ষার্থীদের, বিশেষ করে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর (ম্রো, ত্রিপুরা, মারমা) নারী শিক্ষার্থীদের, উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য পার্শ্ববর্তী উপজেলা বা জেলা সদরে যাওয়া ছিল প্রায় অসম্ভব। কলেজটি জাতীয়করণ করা হলে তা এই বিশাল এলাকার শিক্ষার্থীদের দোরগোড়ায় সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী উচ্চশিক্ষার সুযোগ এনে দেবে এবং শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার কমাবে।
২. প্রান্তিক পাহাড়ি ও বাঙালি জনগোষ্ঠীর শিক্ষার অধিকার নিশ্চিতকরণ
আলীকদম একটি মিশ্র জনপদ, যেখানে পাহাড়ি ও বাঙালি দুই সম্প্রদায়েরই বসবাস। এই অঞ্চলে শিক্ষার হার জাতীয় গড়ের চেয়ে কম। ২০২৩ সালে উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় জনসাধারণের উদ্যোগে কলেজটি স্থাপন হওয়ায় এটি এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর, বিশেষ করে ম্রো সম্প্রদায়ের নতুন প্রজন্মের উচ্চশিক্ষা গ্রহণের একমাত্র ভরসা। কলেজটি জাতীয়করণ করা হলে সরকারি সুযোগ-সুবিধা, অবকাঠামো ও শিক্ষক-শিক্ষিকার নিশ্চয়তা বাড়বে, যা পিছিয়ে পড়া পাহাড়ি-বাঙালি সকল শিক্ষার্থীর শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করবে।
৩. বৈষম্য দূরীকরণ ও সরকারি শিক্ষানীতির প্রতিফলন
সংবিধান অনুযায়ী সকল নাগরিকের জন্য শিক্ষা নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম দায়িত্ব। আলীকদমের মতো একটি বৃহৎ এবং আর্থ-সামাজিকভাবে পিছিয়ে পড়া উপজেলায় দীর্ঘকাল ধরে কোনো স্বতন্ত্র কলেজ না থাকা ছিল একটি বড় বৈষম্য। বর্তমানে স্থানীয় উদ্যোগে এটি স্থাপিত হওয়ায়, দ্রুত জাতীয়করণ করা হলে তা সরকারের ‘শিক্ষা ক্ষেত্রে বৈষম্য দূরীকরণ’ নীতির একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে এবং দেশের সকল অঞ্চলে মানসম্মত শিক্ষা বিস্তারের অঙ্গীকার প্রতিফলিত হবে।
৪. সীমান্ত নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা
আলীকদম উপজেলাটি মিয়ানমার সীমান্ত সংলগ্ন হওয়ায় এটি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সীমান্ত এলাকার তরুণদের শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত রাখলে তারা নানা ধরনের অসামাজিক কার্যকলাপে জড়িয়ে পড়তে পারে। একটি মানসম্মত জাতীয়করণকৃত কলেজ তরুণদের শিক্ষামুখী করে তুলবে এবং সমাজের মূলধারায় এনে সীমান্ত এলাকার সামাজিক স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে পরোক্ষভাবে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
৫. আর্থিক সক্ষমতা ও উন্নত অবকাঠামোর প্রয়োজনীয়তা
স্থানীয় জনগণের উদ্যোগে কলেজটি স্থাপিত হলেও, এর নিয়মিত পরিচালন ব্যয়, উন্নত ল্যাবরেটরি স্থাপন, আধুনিক পাঠাগার তৈরি এবং মানসম্মত শিক্ষক নিয়োগের জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন। প্রায় ৬৫ হাজার মানুষের শিক্ষা চাহিদা পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় টেকসই ও উন্নত অবকাঠামো কেবল জাতীয়করণের মাধ্যমেই নিশ্চিত করা সম্ভব। এটি কলেজের আর্থিক ভিত্তি সুদৃঢ় করবে এবং ভবিষ্যতে এই প্রতিষ্ঠানকে একটি পূর্ণাঙ্গ ডিগ্রি কলেজে উন্নীত করার পথ সুগম করবে।
উপসংহার: আলীকদম কলেজকে জাতীয়করণ করা হলে এটি কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সরকারি স্বীকৃতি পাবে না, বরং দেশের সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিত এবং পিছিয়ে পড়া একটি বৃহৎ জনপদের ৬৫ হাজার মানুষের জন্য উচ্চশিক্ষার দুয়ার উন্মোচিত হবে। আশা করা যায়, সরকার এই যৌক্তিক কারণগুলো বিবেচনা করে কলেজটি দ্রুত জাতীয়করণের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
আপনার মতামত লিখুন :