
যারা প্রকৃতির দুর্গম পথে হাঁটতে ভালোবাসেন, যারা ঝর্ণার কলতানে মনকে সিক্ত করতে চান, তাদের জন্য অপেক্ষা করছে বান্দরবানের আলীকদমের এক নতুন বিস্ময়—তুই ইং ঝর্ণা বা তিনাম ঝর্ণা। মাতামুহুরী রিজার্ভের গভীরে, সুউচ্চ পাহাড়ের নিরালায় লুকিয়ে থাকা এই ঝর্ণা এখনো লোকচক্ষুর আড়ালে তার অপার সৌন্দর্য বিছিয়ে রেখেছে।
অবস্থান ও নামকরণ: ‘তুই ইং’ বা কালো জল
তিনাম ঝর্ণাটি আলীকদম উপজেলার কুরুকপাতা ইউনিয়নে অবস্থিত। এর সুনির্দিষ্ট অবস্থান হচ্ছে মাতামুহুরী রিজার্ভের গভীরে। আলীকদম সদর থেকে মাতামুহুরী নদীপথে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে এর অবস্থান। পোয়ামুহুরী বাজার থেকে উজানের দিকে ইঞ্জিন চালিত নৌকায় আনুমানিক আধাঘণ্টার পথ পাড়ি দিলেই পৌঁছানো যাবে এই ঝর্ণার কাছাকাছি।
স্থানীয় ম্রো জনগোষ্ঠী এই ঝর্ণাকে ‘তুইং ঝিরি ঝর্ণা’ বা ‘তুই ইং ঝর্ণা’ নামেও চেনেন। ম্রো ভাষায় ‘তুই’ শব্দের অর্থ পানি এবং ‘ইং’ শব্দের অর্থ ‘কালো’। সম্ভবত ঝর্ণার গভীর অংশের জলের রং বা এর চারপাশের ঘন ছায়ার কারণে এমন নামকরণ হয়েছে।
তিনামের অনন্য বৈশিষ্ট্য
তিনাম ঝর্ণার সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হলো এর পাশাপাশি দুটি স্রোতধারা। অন্তত দেড়শ ফুট উঁচু পাহাড়ের খাদ বেয়ে অবিরাম ধারায় নেমে আসে এর জলরাশি। ঝর্ণার পাদদেশে রয়েছে দুটি জলাশয়। তার পাশেই দেখা যায় দুটি সুড়ঙ্গ। এটি আলীকদম উপজেলায় এ পর্যন্ত আবিষ্কৃত ঝর্ণাগুলোর মধ্যে সর্বশেষ সংযোজন। মূলত, ঘনঘোর আষাঢ়-শ্রাবণের ভরা বর্ষায় এর রূপ হয়ে ওঠে আরও মনোমুগ্ধকর। যদিও বছরের অন্য সময়ে পানির প্রবাহ কিছুটা কমে আসে, তবে শ্রাবণ শেষে ভাদ্রের মাঝামাঝিতেও এর যৌবনে ভাটা পড়েনি। এটি পর্যটকদের মুগ্ধ করার জন্য যেন সবুজ পাহাড়ের নীরব অভ্যর্থনা।
আবিষ্কারের প্রেক্ষাপট
২০১৯ সালের আগস্ট মাসের শেষ সপ্তাহে ঢাকার চার পর্যটক আলীকদমের রূপমুহুরী ঝর্ণা দেখতে যান। সেখানে স্থানীয় এক বাসিন্দার কাছে তারা জানতে পারেন পোয়ামুহুরী থেকে মাত্র ৩০ মিনিটের নৌপথের দূরত্বে লুকিয়ে আছে আরেকটি ঝর্ণা, যার নাম ‘তুই ইং বা তিনাম’। আরও বিস্ময়কর তথ্য হলো, এই ঝর্ণায় এর আগে কোনো পর্যটকের পদচিহ্ন পড়েনি! এই খবর শুনেই চার পর্যটক লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকা তিনাম ঝর্ণা দেখতে উৎসুক হন। তাদের দলনেতা মোহসিন হোসেনের মতে, তিনাম সত্যিই অনেক সুন্দর একটি ঝর্ণা।
একই ভ্রমণে দুটি ঝর্ণার মুগ্ধতা
তুই ইং বা তিনাম ঝর্ণা দেখতে গিয়ে পর্যটকরা একই সাথে রূপমুহুরী ঝর্ণার সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন। রূপমুহুরী ঝর্ণার মুগ্ধতা দেখে এর আগেও শত শত পর্যটক মাতামুহুরী নদীপথে পোয়ামুহুরী গিয়েছেন। ২০১৭ সালের জুলাই মাসে আবিষ্কৃত হওয়া দামতুয়া ঝর্ণা ও জলপ্রপাত দেখতেও বর্তমানে পর্যটকরা আলীকদম-থানচি সড়কের ১৭ কিলোমিটার এলাকায় যাচ্ছেন। তবে রূপমুহুরী ও তুই ইং ঝর্ণার প্রাকৃতিক রূপ ও গঠনশৈলী নিঃসন্দেহে পর্যটকদের মুগ্ধ করার মতো। এছাড়াও, ঝর্ণা দেখতে যাওয়ার পথে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ মাতামুহুরী নদীর নৈসর্গিক সৌন্দর্য অবলোকন করা যায়, যা এই ভ্রমণের বাড়তি পাওনা।
ভ্রমণের সেরা সময়:
প্রস্তুতি ও সতর্কতা
দুর্গম পাহাড়ি পথে ভ্রমণের জন্য কিছু জরুরি প্রস্তুতি নেওয়া আবশ্যক:
তিনাম ঝর্ণায় পৌঁছানোর ধাপ
কাছাকাছি আকর্ষণ
একই ভ্রমণে আপনি রূপমুহুরী ঝর্ণা এবং মাতামুহুরী নদীর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যও উপভোগ করতে পারবেন। এটি আপনার ভ্রমণের অভিজ্ঞতাকে আরও সমৃদ্ধ করবে। তবে, তিনাম ঝর্ণার কালো জলের রহস্য এবং এর অসাধারণ রূপ আপনাকে মুগ্ধ করবে নিশ্চিত। নি:সন্দেহে তিনাম বা তুই ইং ঝর্ণা সত্যিই প্রকৃতির এক অসাধারণ দান, যা পর্যটকদের জন্য এক রোমাঞ্চকর এবং অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা নিয়ে আসে।
লেখক: সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান পার্বত্য জেলা। 01556560126
আপনার মতামত লিখুন :