থানচিতে খিয়াং নারী হত্যা: সংবাদ সম্মেলনে ন্যায়বিচারের জোর দাবি
Momtaj Uddin Ahamad
প্রকাশের সময় : মে ১২, ২০২৫, ৫:১৪ পূর্বাহ্ন /
০
আলীকদম (বান্দরবান), ১২ মে: বান্দরবানের থানচি উপজেলার তিন্দু এলাকায় এক খিয়াং নারীকে ধর্ষণ ও নৃশংসভাবে হত্যার অভিযোগের ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে আলীকদম উপজেলার সচেতন নাগরিক সমাজ। আজ (১২ মে) আলীকদমে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা এই পাশবিক হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত, দোষীদের দ্রুত গ্রেপ্তারপূর্বক দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং ভুক্তভোগীর পরিবারকে সুরক্ষা ও সহায়তা প্রদানের জোর দাবি জানান। একইসঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সারাদেশে আদিবাসী নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণেরও আহ্বান জানানো হয়।
১২ মে আলীকদমে আয়োজিত এই সংবাদ সম্মেলনে আলীকদম উপজেলার সচেতন নাগরিকদের পক্ষে মেছেংবু মার্মা লিখিত বক্তব্যে বলেন, গত ৫ই মে থানচির দুর্গম এলাকা থেকে তিন সন্তানের জননী এক খিয়াং নারীর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় গোটা পার্বত্য অঞ্চলসহ দেশবাসী গভীরভাবে মর্মাহত ও ক্ষুব্ধ। বক্তারা বলেন, “প্রাথমিক তথ্য ও পারিপার্শ্বিক আলামতে এটি স্পষ্ট যে, তাকে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। আমরা জানতে পেরেছি, ঘটনার আগের দিনও ভুক্তভোগী নারীকে কতিপয় দুর্বৃত্ত উত্ত্যক্ত করেছিল।”
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে মাথায় পাথর দিয়ে আঘাত করে হত্যার বিষয়টি উঠে এলেও ধর্ষণের মতো স্পর্শকাতর অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করা হয়।
বক্তারা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “এই ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর সহিংসতা ও নির্যাতনের ঘটনা ক্রমাগত ঘটে চলেছে। থানচির এই ঘটনা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নারীদের নিরাপত্তা এবং মানবাধিকার পরিস্থিতিকে আবারও চরম সংকটের মুখে ফেলেছে। প্রায়শই এ ধরনের ঘটনায় বিচার প্রক্রিয়া বিলম্বিত হয় এবং অপরাধীরা পার পেয়ে যায়, যা নতুন নতুন অপরাধ সংঘটনে মদদ জোগায়।”
সংবাদ সম্মেলন থেকে সরকারের প্রতি বেশ কয়েকটি সুনির্দিষ্ট দাবি তুলে ধরা হয়:
- অবিলম্বে অপরাধীদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি: থানচিতে চিংম্রা খিয়াং নামের এক নারীকে ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত সকল অপরাধীকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে বিচার করতে হবে এবং সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
- নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত: ঘটনার তদন্ত প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ এবং দ্রুততার সাথে সম্পন্ন করতে হবে, যাতে কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা স্থানীয় প্রভাব বাধা সৃষ্টি করতে না পারে।
- ভুক্তভোগীর পরিবারকে সহায়তা: নিহত খিয়াং নারীর শোকসন্তপ্ত পরিবার, বিশেষ করে তার অনাথ সন্তানদের জন্য যথাযথ ক্ষতিপূরণ, নিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদী সহায়তার ব্যবস্থা করতে হবে।
- ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ: পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সারাদেশে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ও প্রান্তিক নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সরকারকে বিশেষ কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার টহল বৃদ্ধি এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সাথে সমন্বয় সাধন করে একটি আস্থার পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
- নারী নির্যাতন প্রতিরোধে সামাজিক আন্দোলন ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি বন্ধ: নারীর প্রতি সকল প্রকার সহিংসতা রোধে ব্যাপক সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলার পাশাপাশি অতীতের নারী নির্যাতনের অমীমাংসিত ঘটনাসমূহের দ্রুত নিষ্পত্তি করে বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসান ঘটাতে হবে।
বক্তারা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, “থানচিতে খিয়াং নারীর প্রতি যে নির্মমতা দেখানো হয়েছে, তার ন্যায়বিচার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আমরা আমাদের সোচ্চার ভূমিকা অব্যাহত রাখব।” তারা এই ধরনের পাশবিকতা রুখে দিতে এবং একটি নিরাপদ ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় সম্মিলিত প্রচেষ্টার আহ্বান জানান।
সংবাদ সম্মেলনের উপস্থিত ছিলেন পিলিপ ত্রিপুরা, থোয়াইম্রা মার্মা, অংক্যম্রা মার্মা, চাইমং মার্মা, মালিনী ত্রিপুরা, মিথংগ্য মার্মা, সানতুই ম্রো, নুংএচিং মার্মা, য়েইচিং মার্মাসহ স্থানীয় পাহাড়ি সম্প্রদায়ের লোকজন উপস্থিত ছিলেন।
আপনার মতামত লিখুন :