
মমতাজ উদ্দিন আহমদ, আলীকদম (বান্দরবান):
বান্দরবানের আলীকদম উপজেলায় ইয়াবা ও গাঁজাসহ ভয়াবহ মাদক বিস্তারের পেছনে নয়াপাড়া ইউনিয়নের পুরোনো তিনটি রোহিঙ্গা পরিবারসহ মোট সাতটি পরিবার কলকাঠি নাড়ছে বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। বৃহস্পতিবার (২৮ নভেম্বর) অনুষ্ঠিত উপজেলা পরিষদের আইনশৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সদস্যরা এই অভিযোগ উত্থাপন করেন।
সভায় জানানো হয়, প্রশাসনের ধারাবাহিক মাদকবিরোধী অভিযানে গত এক সপ্তাহে ৮টি মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে অন্তত ৯ জন মাদকসেবী ও কারবারিকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
মাদকের আখড়া ‘বাগান পাড়া’:
আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও একজন বিএনপি নেতার দেওয়া তথ্যানুযায়ী, নয়াপাড়া ইউনিয়নের ৪ এবং ৫ নম্বর ওয়ার্ডের মধ্যবর্তী বাগান পাড়া এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে বসবাসরত এই সাতটি পরিবারই মাদক ব্যবসার মূল হোতা। স্থানীয়দের কাছে ‘পুরাতন রোহিঙ্গা’ হিসেবে পরিচিত তিনটি পরিবারের সদস্যরা সরাসরি ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদক ব্যবসায় যুক্ত।
অভিযুক্তদের মধ্যে পুরাতন রোহিঙ্গা আব্দুল গফুরের মেয়ে লায়লা বেগম, হাবিবুর রহমানের ছেলে মনু এবং হায়দার আলীর মেয়ে আসমার নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়। জানা গেছে, আব্দুল গফুর, হাবিবুর রহমান ও হায়দার আলী তিন সহোদর। এদের মধ্যে হাবিবুর রহমান কৌশলে আগেই বাংলাদেশের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন।
এই তিন রোহিঙ্গা পরিবারের পাশাপাশি খুচরা মাদক বিক্রিতে স্থানীয় আরও চারটি পরিবার জড়িত। তারা হলেন—স্থানীয় আব্দুল মোনাফের ছেলে রুহুল কাদের, আয়ত করিমের ছেলে মো. আয়ুব, নুর মোহাম্মদ বাবুলের ছেলে জাফর আলম এবং মো. ফরিদের স্ত্রী সেতারা বেগম।
রোহিঙ্গাদের ভোটার হওয়া নিয়ে উদ্বেগ:
সভায় উদ্বেগ প্রকাশ করা হয় যে, অনেক রোহিঙ্গা নাগরিক কৌশলে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। তাদেরকে শনাক্ত করে তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার জন্য সভায় নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট ইউপি চেয়ারম্যানকে দ্রুত তালিকা প্রদানের অনুরোধ জানানো হয়েছে।
ধারাবাহিক অভিযানে ৯ জনের সাজা:
উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মনজুর আলম জানান, মাদকের বিরুদ্ধে গত ২১ নভেম্বর থেকে ২৬ নভেম্বর পর্যন্ত ধারাবাহিক অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এ সময়ে ৮টি মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে মোট ৯ জন মাদকসেবীকে আটক করে বিভিন্ন মেয়াদে জেল হাজতে প্রেরণ করা হয়েছে। সাজাপ্রাপ্তদের সর্বোচ্চ ১ বছর ১০ মাস এবং সর্বনিম্ন ৩ মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
সাজাপ্রাপ্তদের তালিকা ও মামলার বিবরণ:
ইউএনও কার্যালয় সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, পরিচালিত মোবাইল কোর্টে সাজাপ্রাপ্ত আসামীদের বিবরণ নিম্নরূপ:
১. মো: মিজান (২৫), পিতা: জহির উদ্দিন আহম্মদ, সাং- আমির হোসেন সর্দারপাড়া, চৈক্ষং, আলীকদম (মামলা নং-৯০/২০২৫)। সাজা: ০৩ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও ৫০ টাকা অর্থদণ্ড।
২. জামাল উদ্দিন (৫৫), পিতা: মৃত জিয়াউল হক, সাং- রেপারপাড়া, চৈক্ষং, আলীকদম (মামলা নং-৯১/২০২৫)। সাজা: ০১ বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও ১০০ টাকা অর্থদণ্ড।
৩. মো: মানিক (২৩), পিতা: জহুরুল, সাং- বাগানপাড়া, নয়াপাড়া, আলীকদম (মামলা নং-৯২/২০২৫)। সাজা: ০৩ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও ৫০ টাকা অর্থদণ্ড।
৪. মো: শাকিল (২২), পিতা: মো: শাহ আলম, সাং- লিয়াকত আলী পাড়া, আলীকদম (মামলা নং-৯৩/২০২৫)। সাজা: ০৩ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও ৫০ টাকা অর্থদণ্ড।
৫. মো: আলী হোসেন (২২), পিতা: মো: এমরান, সাং- পানবাজার, আলীকদম (মামলা নং-৯৪/২০২৫)। সাজা: ০১ বছর ১০ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও ১০০ টাকা অর্থদণ্ড।
৬. মো: রায়হান (২৫), পিতা: আবদুল সোবহান, সাং- বাগান পাড়া, নয়াপাড়া, আলীকদম (মামলা নং-৯৫/২০২৫)। সাজা: ০১ বছর ১০ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও ১০০ টাকা অর্থদণ্ড।
৭. আলা উদ্দিন (১৯), পিতা: ছৈয়দ নূর ও মেহেদী হাসান সোহাগ (২০), পিতা: মো. নূর, উভয় সাং- পানবাজার, আলীকদম (মামলা নং-৯৬/২০২৫)। সাজা: উভয়কেই আলাদাভাবে ০৩ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও ৫০ টাকা অর্থদণ্ড। ৮. নাইম সরকার (২৫), পিতা: গিয়াস উদ্দিন আহম্মদ, সাং- সিলেটি পাড়া, আলীকদম (মামলা নং-৯৭/২০২৫)। সাজা: ০৩ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও ৫০ টাকা অর্থদণ্ড।
ইউএনও কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, গত ২১ নভেম্বর রাতে অভিযুক্ত রোহিঙ্গা নারী লায়লা বেগমের বাড়িতে ইউএনও’র নেতৃত্বে অভিযান চালানো হয়। সে সময় লায়লার মেয়ে প্রশাসনের সাথে উচ্ছৃঙ্খল আচরণ করেন। ওই দিনের অভিযানেই ৩ মাদকসেবীকে আটক করে সাজা দেওয়া হয়েছিল।
আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভা শেষে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের নেতৃত্বে পরিষদ চত্বরে অভিযানে জব্দকৃত ২৩ পিস ইয়াবা, ৩ পুরিয়া গাঁজা এবং ইয়াবা সেবনে ব্যবহৃত বিপুল পরিমাণ ফয়েল পেপার আগুনে পুড়িয়ে ও পানিতে চুবিয়ে ধ্বংস করা হয়।

ইউএনও মনজুর আলম হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, মাদকবিরোধী এই অভিযান অব্যাহত থাকবে। পাশাপাশি মাদকের কুফল সম্পর্কে স্থানীয় জনসাধারণকে সচেতন করতে ইউনিয়ন পর্যায়ে সচেতনতামূলক সভা আয়োজন করা হবে।
আপনার মতামত লিখুন :