রংরাং এর বুকে বাজে বেদনার ধ্বনি


Momtaj Uddin Ahamad প্রকাশের সময় : মার্চ ২১, ২০২৩, ২:২৭ অপরাহ্ন /
রংরাং এর বুকে বাজে বেদনার ধ্বনি

॥ মমতাজ উদ্দিন আহমদ ॥

সন্ধ্যার গোধূলিতে বেদনায় জর্জর রংরাং পর্বত! কি সেই বেদনা রংরাং এর বুকে। শুনি তবে সে গল্প…।

আলীকদম উপজেলায় যে ক’টি প্রাকৃতিক নিদর্শণের জন্য পর্যটকদের আকর্ষণ রয়েছে তারমধ্যে রংরাং পর্বত অন্যতম। রংরাং পর্বতটি আলীকদম উপজেলা সদর থেকে পূর্ব-দক্ষিণে আনুমানিক ৪০ কিঃ মিঃ পূর্বদিকে অবস্থিত।

রংরাং পর্বত

এর উচ্চতা ২ হাজার ৭৯৮ ফুট। এটি চিম্বুক রেঞ্জের একটি সুউচ্চ পর্বত। দূর থেকে দেখলে রংরাং এর সুউচ্চ চূড়াকে মনে হয় নীল দিগন্তের সখা! রংরাং পর্বত ও নীল দিগন্তের মাখামাখি পাহাড়প্রেমীদের হৃদয়ে সৃষ্টি করে স্বর্গীয় আবেশ!

পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী মুরুং ভাষায় ‘রংরাং’ শব্দের অর্থ ধনেশ পাখি। ধনেশ পাখির বিচরণ ক্ষেত্র বলে এ পর্বতটি মুরুংদের কাছে রংরাং তং বা ডং নামে পরিচিত। বছরের অধিকাংশ সময় পর্বতারোহীরা রংরাং পর্বতের সৌন্দর্য অবলোকন করতে সেখানে ট্রেকিং করেন।

রংরাং পর্বত

রংরাং পর্বত সম্পর্কে পর্যটক অপু নজরুল জানান, রংরাং মানে ধনেশ পাখি বা হর্ণবিল। এককালে এ পাহাড়ের ঘন জঙ্গলে অনেক অনেক রাজধনেশের আবাস ছিলো। কিন্তু সমতলের লোভী মানুষরা স্থানীয়দের সামান্য কিছু টাকার প্রলোভনে ফেলে পাহাড়ের সম্পদ নিবিড় চিরসবুজ প্রাকৃতিক বন কেটে নিঃস্ব-দিগম্বর করে দিয়েছে! নগ্ন এসব পাহাড়ে এখন খুব অল্প কিছু বৃক্ষই টিকে আছে শেষমেশ। গভীর বন ছাড়া ধনেশ টিকে থাকতে পারে না। তাই রংরাং বা ধনেশ পাখিও এখন প্রায় নিরুদ্দেশ।

অপু নজরুল জানান, কুসংস্কারগ্রস্থ কিছু মানুষ চিকিৎসার জন্য ইতোপূর্বে দেদারছে ধনেশ শিকার করেছে। সে সময় ঘন নিবিড় অরণ্য ছিল। বন না থাকলে ধনেশ থাকবেনা। কারণ গ্রেট হর্ণবিল হোমসিক লাভার বার্ড। এরা সারাজীবন একই সঙ্গীর সাথে একই বৃক্ষে জীবন কাটিয়ে দেয়।

বনখেকো কাঠচোরদের অতিলোভের পরিণতি হিসেবে রংরাং-এ এখন আগের মতো ধনেশ পাখি দেখা যায় না। এর কারণ হিসেবে জানা যায়, যেহেতু বৃক্ষ থাকছেনা তাই সেই কেটে ফেলা গাছের শোকে হাহাকার করতে থাকে ধনেশ।

অপরদিকে,  সঙ্গীহীন ধনেশ ন্যাড়া পাহাড়ে শিকারীর সহজ শিকারে পরিণত হয়। আর জোড়ার একজন ধরা পড়ে গেলে মুক্ত সঙ্গীও সেই শোক সয়ে বেশিদিন বাঁচতে পারেনা।

ধনেশ পাখি

ধনেশের ইংরেজী নাম Hornbill. এ পাখি শক্ত ও লম্বা বাঁকানো ঠোঁটওয়ালা পাখি হিসেবে পরিচিত। নিচের দিকে বাঁকানো উজ্জ্বল বর্ণের বিশাল ঠোঁট ধনেশের প্রধান বৈশিষ্ট্য। ধনেশের একাধিক প্রজাতি আছে। রংরাং পর্বতে রাজধনেশের আবাস ছিলো।

`Jungle Animals Over 100 Questions and Answers to Things You Want to Know’ বইয়ের তথ্যানুসারে জানা যায়, স্ত্রী ধনেশ গাছের কোটরে ডিম পাড়ে। পুরুষ ধনেশের সহযোগিতায় স্ত্রী ধনেশ ডিমে তা দেয়। বাচ্চাকে বড় করতেও স্ত্রী ধনেশ সময় দেয় বেশী। বাচ্চা বড় হওয়া পর্যন্ত স্ত্রী ধনেশ বাসা থেকে বের হয় না। পুরো সময়জুড়ে খাবার সংগ্রহ করে স্ত্রী ধনেশের মুখে খাইয়ে দেয় পুরুষ ধনেশ। বাচ্চা উড়তে না শেখা পর্যন্ত স্ত্রী ধনেশ সর্বদায় কাছাকাছি অবস্থান করে।

২১ মার্চ বিশ্ব বন দিবস!

বন দিবসে আমাদের প্রত্যাশা- অনাধিকাল ধরে স্বমহিমায় প্রকৃতির বুকে ঠিকে থাকুক প্রিয় রংরাং পর্বত। এক্ষেত্রে বনখোকো-কাঠচোর এবং যেনতেনভাবে বৃক্ষ নিধনের পারমিট প্রদানে সহায়তাকারী অসাধু কর্মকর্তাদের দৌরাত্ম না কমলে রংরাং এর নৈসর্গিক মহিমা প্রাকৃতির বুকে খুব বেশীদিন ঠিকে থাকতে পারবে না!