মাতামুহুরীর উৎসমুখ যাত্রার গল্প -মমতাজ উদ্দিন আহমদ


Momtaj Uddin Ahamad প্রকাশের সময় : জুলাই ৪, ২০২৩, ৩:০৬ অপরাহ্ন /
মাতামুহুরীর উৎসমুখ যাত্রার গল্প -মমতাজ উদ্দিন আহমদ

পোয়ামুহুরী বাজার ঘাট থেকে আমাদের নৌকা স্রোতের বিপরীতে এগিয়ে চললো। উদ্দেশ্য একটাই- মাতামুহুরী নদীর উৎসমুখ দেখা। মাতামুহুরীর একেবারে উজানের দিকে আমার এ সফর প্রায় ১১ বছর পর। বলে রাখা ভালো- বাংলাদেশের একান্ত নিজস্ব নদী শুধুমাত্র শঙ্খ আর একলা নয়, মাতামুহুরীও। কিন্তু প্রচলিত তথ্যচিত্রে এ তথ্যটি জোরালো নয়।

মাতামুহুরী নদী। মায়ের সাথে নামের সংযুক্তি! এ নদীর কোলে আমার বসবাস। জন্ম এ নদীর পাড়ে। শিশু এবং তারুণ্যের উন্মাদনা কেটেছে এ নদীর বুকেই, কেটেছি সাঁতার তারই স্রোতে!

অনেকের মতো আমারও মাতামুহুরীকে ঘিরে রয়েছে শত স্মৃতি, আনন্দ ও বেদনা। এ নদী যেন জীবনেরসত্তা, বিত্ত-বৈভব আর সুখের প্রবাহ। এ নদী লাস্যময়ী-হাস্যময়ী-রূপময়ী-রহস্যময়ী!

বাংলাদেশ-মায়ানমার সীমান্ত অদ্রি থেকে উৎপত্তি হয়ে বঙ্গোপসাগরে সমাপ্তিস্থল পর্যন্ত এ নদীর চলনের গতি যেন কোন সুরূপা-অপরূপার এঁকেবেঁকে হেঁটে চলা!

মাতামুহুরী নদী সুদূর অতীত থেকে এখানকার প্রাকৃতিক পরিবেশের, ভূ-সম্পদের, অর্থ আর বাস্তুতান্ত্রিকতার প্রাণকেন্দ্র। আমাদরে সাথে এ নদীর সম্পর্ক সতত, প্রাণবন্ত ও অবিচ্ছেদ্য।

অনন্তকালের অভিযাত্রায় মাতামুহুরী যেন সুখ-দুঃখের পরম সাথী। জীবনের এ মধ্যগগণে দাঁড়িয়ে স্বাদ জেগেছে জেগেছিল আবার মাতামুহুরীর উৎসমুখে যাবো!

বছরের যেকোন সময় মাতামুহুরীর বুকে যখন পর্যটকরা ভ্রমণ করেন তখন দু’তীরজুড়ে বিটপী কান্তরের শৈলসারির মুগ্ধতায় ভরে যায় মন।

পোয়ামুহুরীর উজানে মাতামুহুরী নদী ক্রমশঃ ছোট হয়ে আসছে…।

যার অন্তর্নিহিত প্রাকৃতকি সুষমা, সুশোভিত-সুরূপময় নান্দনিকতার প্রকাশ অসাধ্য। কেবল অন্তরের ধ্যানলোকেই বুঝা সম্ভব! সবুজ অরণ্যানীর নান্দনিকতার সাথে নদীর কুলকুল রব প্রকৃতিতে আনে বৈচিত্র্য। যা মানুষের মন-মেজাজ-মননে, প্রাণে-স্পন্দনে, গান-গুঞ্জরণে বিচিত্র ভাব ও আবেশের সৃষ্টি করে।

মাতামুহুরীর একেবারের উজানের দিকটা ভ্রমণ নিষিদ্ধ এলাকা। তবে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের বিশেষ অনুমতি নিয়ে আমাদের এই সফরসূচী নির্ধারণের সুযোগ হয়। নদীপথে যাত্রা শুরুর গল্পের আগে মাতামুহুরীর উৎসমুখ প্রস্তুতিপর্বের কিছুটা ধারণা দেয়া যাক! পাঠকের ধৈর্যচ্যুতি হলে গল্পটি ধান ভানতে শীবের গীতের মতো লাগবে বৈকি!

সফরসূচীর নির্ধারিত ছক অনুযায়ী আমার প্রিয় পর্যটক মোহাম্মদ ইছমত ই ইলাহী ভাইয়ের নেতৃত্বে ঈদের পরদিন (৩০ জুন) প্রেসক্লাবে জমায়েত হলেন সর্বজনাব শিহাব উদ্দীন রিয়াদ, মোঃ আবু নঈম লাভলু, ডাক্তার মোঃ বাবর আলী, রাশিক হাফিজ, মোঃ জাকির হোসেন, মোঃ ওমর ফারুক ও মুনতাছিরুল হক তাইছির প্রমুখ। সাথে যোগ দিলেন ইছমত ই ইলাহী ভাইয়ের বাল্যবান্ধবী ও ক্লাসফ্রেন্ড কবি ও শিক্ষক জয়নব আরা বেগম ও তার মেয়ে শফকাত শফিক।

সকলের মতামতে জানা গেল পোয়ামুহুরী পর্যন্ত ইঞ্জিন চালিত নৌকায় না গিয়ে আলীকদম-পোয়ামুহুরী সড়কের খেদারঝিরি পর্যন্ত চাঁদের গাড়িতে যাবো। এরপর পোয়ামুহুরী বাজারের রাত্রিযাপন। প্রেসক্লাব থেকে দুপুরে আমাদের যাত্রা শুরু হলো চাঁদের গাড়িতে। উদ্দেশ্য পোয়ামুহুরী বাজার।

আলীকদম-জালানিপাড়া-কুরুকপাতা-পোয়ামুহুরী সড়ক পার্বত্য চট্টগ্রামের একটি উল্লেখযোগ্য সড়ক। পাহাড়ের পর পাহাড় এর গা কেটে এ সুরম্য রাস্তাটি তৈরী করে সেনাবাহিনীর ১৬ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্যাটালিয়ন (১৬ ইসিবি)।

আলীকদম-পোয়ামুহুরী সড়ক।

আলীকদম উপজেলায় পর্যটন শিল্পের বিকাশকে সহজকরণ, গ্রামীণ জনগণের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি ও পার্বত্য চট্টগ্রামের আর্থসামাজিক উন্নয়ন, কৃষিজাত পণ্যের বিপনন, কৃষি নির্ভর শিল্পোন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষাসহ মৌলিক চাহিদা পূরণে এ সড়ক নির্মাণ করে সেনাবাহিনী। কিন্তু নানান সীমাবদ্ধতার কারণে সড়কটি এখনো পর্যটন সড়ক হিসেবে রূপ পরিগ্রহ করতে পারেনি।

বিকেলে আমাদের বহনকারী চাঁদের গাড়ি খেদারঝিরি বিদ্যামনি ত্রিপুরা পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে থামলো। নেমে পড়লাম সকলে। একজন অশীতপর ‍মুরুং বৃদ্ধের কাছ থেকে এক কাঁদি কলা নিলাম ত্রিশ টাকায়। সকলে খেলাম। এবার খেদারঝিরির মুখ থেকে পোয়ামুহুরী বাজারে যেতে হবে আমাদের।

খেদারঝিরি থেকে পোয়ামুহুরী যাওয়ার একমাত্র রাস্তা মাতামুহুরী নদীর পাড়ঘেঁষে পায়ে হাঁটা পথ। দূরত্ব প্রায় এক কিলোমিটার। আলীকদম-পোয়ামুহুরী সড়ক নির্মাণে সরকার ৪৭৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা ব্যয় করলেও পরিতাপের বিষয় সড়কটি পোয়ামুহুরী বাজারে সংযোগ হয়নি। বাজার থেকে এক কিলোমিটার দূরে সড়কটি চলে গেছে দরিপাড়ায়। এ যেন ‘নামে তালপুকুর কিন্তু ঘটি ডুবে না’ অবস্থা। প্রকল্পের নামে সাথে বাস্তবতার মিল নেই!

আমরা নদীপথে হেঁটে পোয়ামুহুরী বাজারে পৌঁছলাম। বিকেল শেষে সন্ধ্যা নামার মূহুর্ত। বাজারের পাশেই ঝর্ণা। নাম ‘রূপমুহুরী’। তাই আলো থাকতে থাকতে ছুট দিলাম ঝর্ণা দেখতে। বাজার থেকে খুব একটা দূরে নয় এই ঝর্ণা। ঝর্ণায় যাওয়ার জন্য পথে সিঁড়ি নির্মাণ করেছে কুরুকপাতা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান।

তারপরও পথটা খানিকটা দুর্গম। সন্ধ্যা ঘনিযে আসছে। মনে ভয়, এলাম তো আলোতে, অন্ধকারে ফেরত যাওয়া যাবে তো?

খানিকক্ষণ হেঁটে পৌঁছালাম রূপমুহুরীর কাছাকাছি। কিন্তু হতাশ হলাম। গত এক দশকের মধ্যে এত কম পানি রূপমুহুরীতে দেখিনি। পানির প্রবাহ একেবারে কম। ঘনঘোর এ বর্ষা মৌসুমে রূপমুহুরীর বুকে পানি নেই! ভাবতেই অবাক লাগলো।

রুপমুহুরী ঝর্ণার বিবর্ণ রূপ

রূপমুহুরীর পাদদেশে প্রায় ২০০ ফুট উপর থেকে পানি এসে পড়ছে। প্রবাহ কম হলেও পানির এই পতনের বিরাম নেই। এই ঝরনায় শীতকালে পানির প্রবাহ একটু কম থাকে। তাই বলে এই বর্ষায় এই ক্ষীণকায় কেন রূপমুহুরী! কারণ হতে পারে রূপমুহুরীর ঝর্ণার ওপরের দিকে ঝুম চাষ হয়েছে কয়েক বছর আগে। তাই বড় বড় গাছ কাটা হয়েছিল। এতে পানির উৎস নষ্ট হয়েছে! এ যেন দেখার কেউ নেই!

রূপমুহুরীর জীর্ণশীর্ণ বিপন্ন অবস্থা দেখে হতাশ হয়ে সন্ধ্যা নামার পূর্বেই বাজারে ফিরে এলাম। আষাঢ়েই আমাদের এই বর্ষাযাত্রা।

তাই আপাত গল্প শেষ ভাবলেও গল্পের শুরু হল এখানে!

পোয়ামুহুরীর ওপরে মাতামুহুরী নদীতে ইছমত ভাই আর আমি জাল দিয়ে মাছ শিকার করছি।

সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। ইছমত ভাই বললেন মাতামুহুরী নদীতে জাল দিয়ে মাছ ধরবেন। তাতেই হবে রাতের আহার! সন্ধ্যা থেকে রাত দশটা অবধি মাতামুহুরী নদীতে মাছ শিকার করে সেই মাছ দিয়ে আমাদের রাতের খাবার তৈরী হলো। রাতে বাঁশ সমিতির অফিসে সকলেই নিন্দ্রাদেবীর কোলে ঢলে পড়লাম। কখন ভোর হলো জানা হলো না!

এবার প্রস্তুতি নেওয়ার পালা। সকাল আটটার খানিক আগে আমাদের মাতামুহুরীর উৎসমুখ যাত্রাপর্ব শুরু হলো।

নদীতে পানি কম। তাই ইঞ্জিন চালিত নৌকা নেওয়া হলো দু’টি। আমরা যে যার মতো করে নৌকায় উঠে বসলাম।

নৌকার ইঞ্জিনের শব্দ চারপাশের সবুজ নিস্তব্ধতাকে ছারখার করতে করতে এগিয়ে যাচ্ছে। শব্দে গাছপালা বিরক্ত হয় কিনা তা জানা নেই! তবে অনেক দূর যাওয়ার পর নদীর ধারে একটি গাছের মগডালে বসে একটিমাত্র বানরের ঈশারা-ইঙ্গিত, অঙ্গ-ভঙ্গি আর লাফালাফি দেখে মনে হলো সে বিরক্ত। কাছাকাছি পৌঁছাতেই ভেংচি কেটে কয়েক লাফে বানরটি গহীন বনে উধাও হয়ে গেলো।

উৎসমুখে যেতে যেতে মাতামুহুরী নদীকেন্দ্রী কিছুটা তথ্য জেনে নেয়া যাক।

তৎকালীন বৃটিশ সরকার ১৮৮০ সালের ১৭ নভেম্বর মাতামুহুরী নদীর উপত্যকায় ১ লক্ষ প্রায় ৩ হাজার একর পাহাড়কে ‘মাতামুহুরী রিজার্ভ ফরেস্ট’ ঘোষণা করেন। ব্রিটিশ সরকারের ১৯৭৮ সালের নথিপত্রে ‘মাতামুহুরী’ নামের তথ্য দেখা যায়।

মার্মা ভাষায় মাতামুহুরী নদীর নাম- মোরেই খ্যোং বা মেরিখ্যাইং। মোরেই বা মুরি শব্দের অর্থ মাতামুহুরী আর খ্যোং বা খ্যাইং শব্দের অর্থ নদী। এ নামকরণের তথ্য পাওয়া যায় পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথম জেলা প্রশাসক CAPTAIN T. H. Lewin কর্তৃক লিখিত THE HILL TRACTS OF CHITTAGONG AND THE DWELLERS THEREIN (1869) গ্রন্থে।

মি. টি.এইচ লুইন তার গ্রন্থে মাতামুহুরীর প্রকৃতি নিয়ে একটি বর্ণনা দেন এভাবে- ‘মাতামুহুরী বা মুরি খ্যাং নদীটি অগভীর…। নদীটির বেশিরভাগ …সামন্তরালভাবে প্রবাহিত হয়েছে। যদিও মোহনায় কয়েটি ভাগে সমুদ্রে মিলিত হয়েছে। নদীটির বেশীরভাগ দৃশ্য একঘেয়ে হলেও উপরের কিছু উপনদী বিশেষ করে তাদের উৎসমুখের কাছাকাছি পাহাড়ি জায়গায় অবিমিশ্র সৌন্দর্যের রূপ দেখা যায়। এই রকম একটি উপনদী টুইন খ্যাং (তৈন খাল) এর উজানে যাওয়ার সময় একটি দৃশ্যের কথা আমার মনে পড়ে।’

মি. টি.এইচ লুইন আরো মন্তব্য করেন, ‘…মাতামুহুরী নদী সমতল এলাকায় প্রবেশ করার পূর্বে পাহাড়ের মধ্য দিয়ে সমান্তরালভাবে প্রবাহিত হয়ে উপত্যকা গড়ে তুলেছে।’

ব্রিটিশ সরকারের উদ্দেশ্য ছিল নদীর দু’পাড়ের পাহাড়ে বনায়নের ফলে যাতে মাতামুহুরীর নাব্যতা সারাবছর ঠিক রাখা যায়। তাই বলা যায়, ২০০০ সালের আগে পর্যন্ত বৃহত্তর মাতামুহুরী রিজার্ভ ফরেস্ট ছিলো মাতামুহুরীর পানির অন্যতম যোগানদাতা। ১৯৯৭ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত প্রচুর বৃক্ষ নিধন হয় মাতামুহুরী রিজাড়জুড়ে। এই সময় পুরো রিজার্ভ ফরেস্ট হয়ে যায় ন্যাড়া।

পাশাপাশি বছরের নির্দ্ধিষ্ট সময়ে চলে মুরুং, ত্রিপুরাসহ অন্যান্য উপজাতীদের পাহাড়ে জুম চাষ। সে কারণে মাতামুহুরী তীর সন্নিহিত পাহাড়ের প্রাণ-প্রকৃতির সীমাহীন ক্ষতি হয় সারাবছরজুড়ে। নদী তরীবর্তী সবুজাভ পাহাড়গুলো হয়ে যায় জুম চাষরে মৌসুমে শ্মশানের ছাইয়ের ধুসরতা।

১৯৯৭ সাল থেকে কাঠ চোর আর বাঁশ নিলাম সিন্ডিকেটের দৌরাত্মে এ রিজার্ভে এখন ১০ শতাংশ প্রাকৃতিক বনও অবশিষ্ট নেই। পাহাড়ে যা আছে ছোট গাছপালা আর লতাগুল্ম।

দু’যুগ আগেও স্রোতস্বীনি মাতামুহুরী এবং তার আশপাশ সম্পদ-সম্ভারে ছিল পরিণত। তারুণ্যের উদ্বেলতা ছিল এ সমুদ্রকান্তার প্রবাহে। জল জীববৈচিত্রের বিপুল সম্ভারে ছিল পরিপূর্ণ। নদীর কিছুদূর পর পর ছিল তীব্র স্রোত। যাকে স্থানীয়রা ‘দরদরি’ হিসেবে চিহ্নিত করতো। কিন্তু বর্তমানে নদীটির স্বাভাবিক অবস্থা আর নেই। বন নিধনের ফলে মাতামুহুরীর প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ হয়েছে বিপর্যস্ত।

এবার আসি মূল পর্বে।

আমাদের বহনকারী ইঞ্জিন চালিত নৌকা কয়েক মিটার যেতে যেতে নদীর চরে আটক যাচ্ছে। ফলে বাধ্য হয়েই নৌকা থেকে নেমে আমাদের নৌকা উজানের দিকে ঠেলতে হচ্ছে। আমাদের নৌকার আরোহী রাশিক ভাই আর ফারুক ভাই বারবার নেমে যাচ্ছিলেন নৌকা ঠেলতে।

পায়ে আমার সামান্য কাটা থাকায় আমি নৌকায় বসে তাদের কসরত দেখতেছিলাম। পায়ের অবস্থা দেখে রাশিক ভাই দয়াপরবশ হলেন। তিনি বারবার না নামার জন্য বলা সত্ত্বেও আর না নেমে থাকাটা নিজের কাছেই দৃষ্টিকটু লাগলো। নেমে পড়লাম খানিক পরপর। মাতাহমুহুরীর উজানের দিকে পানির প্রাণপ্রবাহ ক্রমশঃ কমছে। তাই নৌকা উজানের দিকে নিতে কসরত করতে হচ্ছে।

এখন বর্ষাকাল। তারপরও বৃষ্টি নেই। তাই নদীর উজানেও পানির প্রবাহ একেবারে কম। বর্ষায় এখন মাতামুহুরীর পূর্ণযৌবনা থাকার কথা। কিন্তু উজানের দিকে নাব্যতা সংকট দেখা গেলো খরতাপ গ্রীষ্মমৌসুমের মতো।

মাতামুহুরীর এই কম পানি প্রবাহ দেখে মনে হলো আমরা তো যাচ্ছি নদীর উজানে, বঙ্গোপসাগরে নয়। তাই যেকোন নদী কিংবা উপনদীর উজানে পানির প্রবাহ কম থাকবে সেটাই স্বাভাবিক! নদীর বুকে এত কম পানি থাকাকে স্বাভাবিকভাবাই যুক্তিযুক্ত!

আমাদের নৌকা উজানে যাচ্ছে অবিরতভাবে।

যাওয়ার পথে পথে দেখতে পেলাম ইন্দুখাল, সিন্দুখাল, মরণী খাল, তরণী খাল প্রভৃতির। এইসব খাল বা উপনদীগুলো মাতামুহুরী রিজার্ভ ফরেস্টের পূর্ব এবং পশ্চিম অংশের সুউচ্চ পাহাড়ের বুক থেকে উৎপত্তি।

বলা হয়ে থাকে এসব খাল বা উপনদীর উৎস পূর্ব দিকের সাঙ্গু পর্বত রেঞ্জ এবং পশ্চিমের মিরিঞ্জা পর্বত রেঞ্জের বুক থেকে উৎপত্তি হয়েছে। প্রত্যেকটি খাল বা উপনদী প্রজারূপে রাজরূপ ধারণ করে খরস্রোতা মাতামুহুরীর বুকে এসে মিলিত হয়েছে। যারফলে এই তরঙ্গিনী মাতামুহুরীর প্রবাহকে গতিময়তা ও সঞ্জিবনী করেছে।

অবিশ্রান্তভাবে আমাদের নৌকা ছুটে চলছে। আমরা যত গভীরে যাচ্ছি  পাহাড় আরও বড় হতে থাকে। সেই সাথে গাছগুলোও।

নদীর দুই পারের গাছ, ঝোপ-জঙ্গল দেখতে দেখতে সময় বেশ ভালই কাটছিল। মেঘ আর সূর্যের লুকোচুরি খেলায় প্রকৃতি আরও মুগ্ধতায় ভরিয়ে দিচ্ছিল আমাদের।

সময়ের সাথে মাতামুহুরীর নান্দনিক রুপ দেখার পাশাপাশি তার বিচিত্র রূপেরও দেখা পেলাম। খানিক পরপর নদীর স্রোতের তীব্রতা, আবার খানিক পরপর নদীকে দেখা যাচ্ছে একেবারে ম্রিয়মাণ-ক্ষিণকায়ায়!

নদীর কোথাও কোমর পানি, কোথাও আবার পানি গোড়ালি পরিমাণ। আবার ঠিক পাশেই বিশাল খাদ, ফলে নদীর কোথাও তৈরি হয়েছে চক্র, আবার কোথাও বড় পাথরে পানির স্রোত তীব্র ধাক্কা খেয়ে ফুসে উঠছে।

ফারুক ভাইয়ের স্যামসাং এস২৩ আল্ট্রা মডেলের মোবাইলে দারুণসব ছবি ও ভিডিও ধারণ করা হচ্ছিল ফাঁকে ফাঁকে। আমাদের নৌকায় থাকা আন্তরিক এই মানুষটা অমায়িক ব্যবহার এবং বন্ধুবাৎসল্য আচরণে আমাকে মুগ্ধ করেছিল। অপরদিকে, চুপচাপ থাকা নম্রভদ্র রাশিক ভাই নৌকা আটকালেই বিনা বাক্যব্যয়ে নেমে পড়ে আমাদেরকে উজানে নেওয়ার কসরত করতে ছিলেন।

মাতামুহুরীতে…

দারুণসব মানুষের মাঝে থাকার পরও মাতামুহুরীর উৎসমুখ যাত্রার এবারের পর্বে আমাকে কয়েকটি বিষয় বেশ আহত করেছে।

কারণ, ২০১২ সালে আমরা যখন উৎসমুখ যাত্রা করেছিলাম, তখন আমাদের যাত্রায় মুগ্ধতা বাড়িয়েছিল নদীর পাড়ে বিভিন্ন পাখির উড়াউড়ি। সেবার যাত্রার শুরুতেই দেখেছিলাম একজোড়া নদী টিটি‘র। যা আইইউসিএন-এর লাল তালিকায় বিপন্ন আখ্যা পেয়েছে।

একসময় মাতামুহুরীর উজানে এদের দেখা পাওয়া যেত। বাংলাদেশের বিরল আবাসিক পাখি মেঘ হও মাছরাঙা আমাদের নৌকার পাশ ঘেঁসে উড়ে গিয়েছিল। ইংরেজিতে এই পাখির নাম স্টর্ক বিলড কিংফিশার। সেবার চমৎকার দেখতে এই পাখিটির ছবি তুলতেই ব্যস্ত হয়েছিলাম আমরা।

এবার যাত্রার শুরু থেকে উৎসমুখ এবং ফিরতি পথে কোনো প্রকারের পাখির দেখা পেলাম না! যা আমাকে অবাক করেছে। সিন্দুমুখের খানিক ওপরে একটি গাছে মগডালের বানরটিই এবারের যাত্রায় দেখা একমাত্র বন্যপ্রাণী।

আমরা সিন্দুমুখ পার হলাম। ইন্ধুমুখ-সিন্ধুমুখ, দুই জায়াগাতেই ৩০-৪০ ঘর মুরুংদের আবাস। নদীর দুই কুলেই জুম ধান, কলা ইত্যাদির চাষ করছে তারা। যেতে যেতে মুরুং জীবনধারা সম্পর্কে ধারণা নিতে পারেন যে কেউ।

পুরো আলীকদম এলাকাজুড়ে বাঙ্গালিদের পরেই সংখ্যাগরিষ্ঠ জাতি হচ্ছে মুরুং। মুরুংরা বেশ অতিথিপরায়ণ জাতি হিসেবে খ্যাতি আছে। আমরা যেখানে যাচ্ছি সেখানে উৎসমুখের কাছাকাছি শেষ মুরুং পাড়ার নাম ‘পাহাড় ভাঙ্গা পাড়া’।

দেখতে দেখতে চলে এলাম আমরা ঐতিহাসিক মাছখুম!

মাছখুমে সাঁতার

বান্দরবানের স্থানীয় ভাষায় ‘খুম’ মানে গভীর পানি। অর্থাৎ পুরো মাতামুহুরী নদীতে এখনো নিজের আভিজাত্য কিছুটা হলেও ধরে রেখেছে গভীর পানির মাছখুম। কথিত আছে, এই খুমে জাল ফেললে ১ মন ওজনের একেকটি মাছ পাওয়া যায়!

মাছখুমের পানি সবুজাভ-নীল। দু’পাশে বিশাল পাহাড়ের উঁচু ঢাল। মাতামুহুরী এখানে এসে প্রশস্ততা পেয়েছে মাত্র ১০-১২ ফুট আয়তনে। এই খুমের দু’পাশে পাহাড় যেন চেপে ধরতে চায় নদীটাকে। এই মাছখুমের বর্ণনা স্বল্প পরিসরে দেওয়া সম্ভব নয়। পরে মাছুখুম নিয়ে আলাদা প্রতিবেদন তৈরীতে সচেষ্ট হবো।

মাছখুমের গভীর জলে প্রথমে নেমে পড়লেলন শিহাব ভাই। এরপর ইছমত ভাই, লাভলু ভাই, ডাঃ বাবর ভার ও তাইছির ভাই।

মাছখুম

আমার আর থর সয় না! নৌকা থেকে দিলাম ঝাঁপ মাছখুমে! এরফলে আমার প্যান্টের পকেটে থাকা দুইটি এন্ড্রয়েড মোবাইল সলিল সমাধি থেকে রক্ষা পেলেও প্রচুর জলপান করে মুর্চা যায়!

মাছখুমের পর হাঁটতে হবে এবার। মাঝি বদি আলম জানালেন, উজানের দিকে আর নৌকা যাবে না। এক ঘন্টা হাঁটলেই পাওয়া যাবে পাহাড়ভাঙ্গা। পাহাড় ভাঙ্গা থেকে নদীর উৎসমুখ খানিকটা দূরে।

নতুন উদ্যমে শুরু হল আমাদের পথচলা।

নদী পারের ঝোপঝাড় আর নদীর পানি ডিঙ্গিয়ে স্রোতের সাথে শুরু হল লড়াই। ঘন্টা দুয়েক পর আমরা এসে পড়লাম পাহাড় ভাঙ্গা মুরুং পাড়ায়।

এ পাড়ায় ছোট ছোট মাচাং ঘরে মুরুংদের বসবাস আধুনিক পৃথীবির বিলাস-ব্যাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখায়। এরা প্রকৃতি নিয়েই সুখী। এরা আধুনিক পৃথিবী থেকে দূরে-অনেক দূরে। ছোট ছোট সব শিশুই উদোম দেহে ঘুরাঘুরি করে। খেলছে নদীর বুকে গড়াগড়ি কিংবা সাঁতার কেটে।

পাহাড় ভাঙ্গা মুরুং পাড়ায় আমাদের টীমের কেউ কেউ হালকা চা-বিস্কুট খেয়ে রওনা হতে দেরি হলো। কারণ আমাদের সাথে থাকা ডাক্তার বাবর ভাই রুগী দেখছেন। আমাদের টীমের বাবর ভাই একজন মেধাবী ডাক্তার। একই সাথে লেখকও তিনি। ‘ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভাঙ্গে’, ডাক্তার বাবর ভাই তাই দেখিয়ে দিলেন। নিজেদের প্রয়োজনের কথা বিবেচনায় নেয়া ওষুধ বিতরণ করা হলো পাড়ার অসুস্থ রোগীদের মাঝে।

পাড়ার ঘাটে দুই ফটোজেনিক মুরুং কিশোরীর সাথে ফটোফটোসেশানে আরো কিছু সময় ব্যয় হলো। এরপর আমরা রওনা হলাম দোছরি-ফাত্তারার উদ্দেশ্যে। যেখান থেকে উৎপত্তি হয়েছে মাতামুহুরী নদী। অবশেষে পৌঁছে গেলাম মাতামুহুরীর উৎসে!

আমরা দেখতে পেলাম একটা পাহাড় মাতামুহুরীর জলধারাকে ২ ভাগে ভাগ করে ফেলেছে। বামের দিকের ছড়াটার নাম দোছড়ি, আর ডান দিকেরটা ফাত্তারা ছড়া বা খাল নামে পরিচিত।

দোছরি ও ফাত্তারা পৃথক দু’টি খাল বা উপনদী। এ দু’টি খালের সংযোগ স্থল থেকেই মাতামুহুরী নদীর শুরু! এ স্থানটি ইংরেজি Y (ওয়াই) অক্ষরের মতো।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ২ ছড়া বা খাল মিলে তৈরি করেছে মাতামুহুরী! তবে গুগল ম্যাপ দেখিয়েছে  ফাত্তারা খালের উজানের দিকের অংশটাও মাতামুহুরী।

তবে স্থানীয়দের অভিমত, দোছারী খাল এবং ফাত্তারা খালের সংযোগস্থলের উজানে আর মাতামুহুরী নেই। অর্থাৎ দোছারী-ফাত্তারা খালারের মোহনা থেকেই মাতামুহুরীর উৎপত্তি।

এখানে একটি বিষয় বেশ কৌতুহলের সাথে লক্ষ্য করলাম, দোছরীর পানি খানিকটা গরম আর ফাত্তারা খালের পানি কনকনে ঠান্ডা। তাই দোছরীতে নয়, ফাত্তারার শীতল জলে শুয়ে বসে সময় পার করলাম বেশীক্ষণ। নদীর উৎসমুখে ফারুক ভাই ফটোশেসন ও ভিডিও তৈরী করলেন বেশ কয়েকটি। তার ছবি তোলা এবং ভিডিও করার কেরামতি বেশ মুদ্ধকর!

মনের সকল দ্বিধা, সংকোচ আর পাওয়া-না পাওয়ার সকল বেদনা পেছনে ফেলে বিশ্বপ্রকৃতির নিয়ন্তা মহান আল্লাহর অপরূপ সৃষ্টিলীলায় আভিভূত হয়ে ডুব দিলাম মাতামুহুরীর উৎসে-ফাত্তারারা শীতল জলে!

কীভাবে_যাবেন: ঢাকা থেকে সরাসরি আলীকদমে শ্যামলী কিংবা হানিফ পরিবহন সার্ভিস আছে। প্রতি টিকেটের মূল্য 11০০ টাকা। আলীকদম এসে রাত্রী যাপন করতে চাইলে অর্কিড রেস্টুরেন্ট এন্ড রেসিডেন্সিয়াল,

দ্যা দামতুয়া ইন, মারাইংতং ইকো রিসোর্ট-এ অবস্থান করতে পারেন।

আলীকদম থেকে ইঞ্জিন চালিত নৌকায় কিংবা আলীকদম-পোয়ামুহুরী সড়কযোগে যেতে হবে ‘পোয়ামুহুরি বাজার পর্যন্ত। বাজারের পাশে রয়েছে “রূপমুহুরী ঝর্ণা”।

আলীকদম থেকে পোয়ামুহুরী পর্যন্ত প্রতিজন নৌকাযোগে প্রতিজন ভাড়া পড়বে ৪০০ টাকা। সড়ক পথে জীপে কিংবা সিএনজিতে গেলে জনপ্রতি ৪০০ টাকা, মোটর সাইকেলে গেলে ৫০০ টাকা।

পোয়ামুহুরী থেকে মাতামুহুরীর উৎসমুখ পর্যন্ত রিজার্ভ ভাড়া 5-6 হাজার টাকা।

পোয়ামুহুরী থেকে উৎসমুখের দিকে প্রতি নৌকায় যাওয়া যায় 6/7 জন। সে হিসেবে আলীকদম থেকে জনপ্রতি মাতামুহুরীর উৎস মুখ পর্যন্ত যাওয়া আসা ভাড়া পড়বে জনপ্রতি প্রায় ২০০০ হাজার টাকা।

মনে_রাখবেন: নদী ও প্রকৃতি আমাদের সম্পদ। এর সুরক্ষার দায়িত্ব আমাদের। নদীপথে ভ্রমণের সময় চিপসের প্যাকেট, সিগারেটের ফিল্টার, পানির বোতলসহ অন্যান্য আবর্জনা যেখানে সেখানে ফেলবেন না। অপচনশীল এসব আবর্জনা ফেললে পরিবেশ নষ্ট হয়।  আসুন নিজে বাঁচি, প্রকৃতিকে বাঁচাই!

সতর্কতাঃ মাতামুহুরীর উৎসমুখ ভ্রম এখনো পর্যন্ত ভ্রমণ নিষিদ্ধ এলাকা। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের বিশেষ অনুমতি পেলে যাওয়া যায় এইসব এলাকায়। তাই বিনা অনুমতিতে এই এলাকা ভ্রমণ না করাই শ্রেয়।

লেখক: মমতাজ উদ্দিন আহমদ, সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান, মোবাইল : 01556560126, তারিখ: 04 জুলাই ২০২৩ খ্রিঃ।