ঐতিহাসিক আলীর সুড়ঙ্গ ও চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙের ভবিষ্যৎ বাণী


Momtaj Uddin Ahamad প্রকাশের সময় : নভেম্বর ২২, ২০২৩, ১:৪৪ অপরাহ্ন /
ঐতিহাসিক আলীর সুড়ঙ্গ ও চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙের ভবিষ্যৎ বাণী

।। মমতাজ উদ্দিন আহমদ।।

সপ্তদশ শতকের বিখ্যাত চীনা বৌদ্ধ ভিক্ষু ও পর্যটক হিউয়েন সাঙ তার লেখায় বলেছিলেন, ‘নদী-নব্য জলাভূমির এ দেশে যে কোন প্রাকৃতিক নিদর্শন অতি সহজেই হারিয়ে যেতে পারে।’ চীনের এই  পরিভ্রাজকের ভবিষ্যৎ বাণীর এ ইঙ্গিত সত্য হতে চলেছে পাহাড়ি জেলা বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার ঐতিহাসিক আলীর সুড়ঙ্গের বেলায়।

বুধবার (২২ নভেম্বর) বান্দরবান জেলার একদল সাংবাদিকদের সাথে আলীর সুড়ঙ্গ পরিদর্শন করেন এ প্রতিবেদক।

আমি সর্বপ্রথম ঐতিহাসিক এই আলীর সুড়ঙ্গ পরিদর্শন করেছিলাম ২০০০ খ্রিস্টাব্দের শুরুর দিকে। পরিদর্শন শেষে স্থানীয় দৈনিক চকোরীতে ‘কিংবদন্তির আলীর সুড়ঙ্গ’ শিরোনামে প্রথম উপ-সম্পাদকীয় লিখেছিলাম।

২০০০ সালের পর থেকে একাধিকবার আলীর সুড়ঙ্গে যাওয়ার সুযোগ হয় আমার। গত কয়েকবছর আগেও আলীর সুড়ঙ্গের যে কাঠামো লক্ষ্য করেছিলাম সেই কাঠামোয় বর্তমানে পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। ২০০০ সালে দেখা কাঠামোর সাথে বর্তমান কাঠামোর অনেকখানি পরিবর্তন দৃশ্যমান।

গত একদশক আগের আলীর সুড়ঙ্গে যাওয়ার যে ঝিরি পথটি ছিলো, তা অনেকখানি খাদে পরিণত হয়েছে। ঝিরির তলদেশের মাটি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে গেছে। ঝিরি থেকে গুহামুখ অনেকখানি উপরে উঠে গেছে। মূলতঃ এসব পরিবর্তন ঘটেছে ঝিরির মাটি সরে গিয়ে ক্রমশ খাদে পরিণত হওয়ার কারণে।

আলীর সুড়ঙ্গে একসময় প্রচুর বাদুড় দেখা গেলেও এখন সেইসব বাদুড়ের দেখা মিলে না।

আলীর সুড়ঙ্গ নিয়ে অনেক রূপকথা, কিংবদন্তি ও ঐতিহসাহিক তথ্যের ধুম্রজাল রয়েছে। আলীর সুড়ঙ্গকে উপজেলা প্রশাসনের ওয়েব পোর্টালে ‘ঐতিহাসিক আলীর সুড়ঙ্গ’ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

মূলতঃ ইতিহাসের কী উপদান এই সুড়ঙ্গ ঘিরে আছে তা নিয়ে কোন জার্নাল কিংবা গবেষণাপত্রে তথ্য-উপাত্ত দেখা যায় না।

তবে ধারণা করা হয়, ১৬৬০ খ্রিস্টাব্দে আওরঙ্গজেবের সেনাপতি মীরজুমলা পিছু ধাওয়া করলে শাহ সুজা তার অনুগত ফতে খাঁ, গোলাম হোসেন খাঁ, শের জব্বার খাঁ, নুরুল্লা খাঁ, শের দৌলত খাঁসহ ১৮ জন সেনাপতি এবং তাদের অধীনে বিপুল সংখ্যক মোগলযোদ্ধাদের নিয়ে চট্টগ্রাম হয়ে নাফ নদীর তীরে পৌঁছান।

কিন্তু আরাকান রাজের শর্ত মোতাবেক সকল যোদ্ধাদের সেখানেই বিদায় জানিয়ে মাত্র ২০০ জন দেহরক্ষী নিয়ে নাফ নদী পারি দিয়ে আরাকানের রাজধানী ¤্রােহং-এ উপস্থিত হন শাহ সুজা। কিন্তু আরাকান রাজের বিশ্বাসঘাতকতায় শাহ সুজা ১৬৬১ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসেই আত্মীয়-স্বজন সহ অত্যন্ত করুণভাবে নিহত হন।

এরপর মোগল সেনাপতিগণ দেখতে পান সম্মুখে আরাকান বাহিনী এবং পেছনে মীর জুমলার বাহিনীর ভয়। এ অবস্থায় তারা অপেক্ষাকৃত দুর্গম অঞ্চলে এসে প্রথম দুর্গ প্রতিষ্ঠা করেন। ইরানের শিয়া বংশোদ্ভূ’ত মোগলযোদ্ধারা ঐ এলাকার নামকরণ করেন হযরত আলীর নামানুসারে ‘আলীকদম’। এরা জুমিয়া মগ, চাকমাসহ অন্যান্যদের জুম চাষাবাদে নিয়োজিত করে আলীকদমে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন জুমিয়া জমিদারী।

তাদের সিলমোহরে ব্যবহৃত হিজরী সন হিসেবে আলীকদমে জমিদার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন যথাক্রমে রাজা ফতে খাঁ, রানী সোনাবি, রাজা শের জব্বার খাঁ, রাজা নুরুল্লা খাঁ, রাজা চন্দন খাঁ এবং রাজা জালাল খাঁ। এরা প্রত্যেকেই ছিলেন শাহ সুজার সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মাধ্যক্ষ বা সেনাপতি।

মুঘল শাসনের এই সময়ে আলীর সুড়ঙ্গ খনন হয়েছিল বলে ঐতিহাসিক মতানুসারে ধারণা করা হয়। তবে অনেকে এ সুড়ঙ্গকে প্রাকৃতিক বলে ধারণা করেন।

আলীর সুড়ঙ্গের ভেতরের পরিবেশটি একসময় বাদুড় প্রজাতির প্রমোদ নীড় ছিলো। এবারের পরিদর্শনে একটি বাদুড়ও দেখা যায়নি। গত কয়েক বছর আগেও সুড়ঙ্গের একপাশে ঢুকে অন্যপ্রান্তে বের হওয়া যেত। এখন বের হওয়ার মুখটি বন্ধ হয়ে গেছে।

এ সুড়ঙ্গের রক্ষণা-বেক্ষণের সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে কোন উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। তবে সুড়ঙ্গে উঠা-নামার সিঁড়ি নির্মাণ করেছে সেনা জোন ও উপজেলা প্রশাসন।

জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী অফিসার জাবের মোঃ সোয়াইব বলেন, আলীর সুড়ঙ্গকে উপজেলা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে এনে পরিকল্পিতভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হবে। সুড়ঙ্গ এলাকায় যাতায়াতে নির্ধারিত ফি আদায়ের মাধ্যমে উপজেলা পরিষদের রাজস্ব আয় বাড়ানো হবে।