ইটভাটা আইন কাগজে আছে, বাস্তবে নেই : আলীকদমে উজাড় হচ্ছে প্রাণ-প্রকৃতি


Momtaj Uddin Ahamad প্রকাশের সময় : ফেব্রুয়ারী ১৫, ২০২৩, ৩:২৭ অপরাহ্ন /
ইটভাটা আইন কাগজে আছে, বাস্তবে নেই : আলীকদমে উজাড় হচ্ছে প্রাণ-প্রকৃতি

মমতাজ উদ্দিন আহমদ, আলীকদম

বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার চৈক্ষ্যং ইউনিয়নের তারাবুনিয়া। এ এলাকায় মেসার্স আল আমিন ব্রিক্স (এবিএম) নামের ইটভাটায় পুরোদমে চলছে ইট প্রস্তুতের কার্যক্রম। পাশাপাশি স্কেটভেটর দিয়ে পাহাড়ি টিলা ও কৃষি জমি কেটে সংগ্রহ করা হচ্ছে ইটভাটার মাটি।

ভাটার আশেপাশে রয়েছে ফসলী জমি, বসতবাড়ি ও বিদ্যালয়। একইভাবে উপজেলার আলীকদম সদর ইউনিয়নের আমতলী ও পূর্ব পালং পাড়ায় রয়েছে একই ধরণের দুটো ইটভাটা। সেসব ইটভাটার পাশেও রয়েছে জনবসতি, ফসলী জমি ও বিদ্যালয়।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন-২০১৩ অনুসারে এসব স্থানে ইটভাটা স্থাপনের কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু ইটভাটা আইন এ উপজেলার ক্ষেত্রে কাগজে আছে, বাস্তবে নেই। আইনের তোয়াক্কা করছেনা ভাটা মালিকরা। এসব ইটভাটায় রাতদিন পোড়ানো হচ্ছে অবাধে গাছ। এতে ধ্বংস হচ্ছে আশেপাশের প্রাণ-প্রকৃতি। বিলীন হচ্ছে পাহাড়ের বৈচিত্র্যময় সৌন্দর্য। ফলে হুমকির মুখে পড়েছে পরিবেশ।

তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, ইটভাটাগুলোর একটিতেও নেই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র। এরপরও বছরের পর বছর ধরে কীভাবে এসব ভাটায় ইট পোড়ানো হয় তার ব্যাখ্যা নেই সংশ্লিষ্টদের কাছেও।

সরেজমিন দেখা গেছে, আলীকদম-ফাঁসিয়াখালী সড়কের তারাবুনিয়া থেকে মইহ্লা পাড়া যাওয়ার রাস্তাটি কয়েকবছর আগেও ছিল এইসবিবি ব্রিকসলিং। রাস্তার মধ্যে ছিল কয়েকটি কালভার্ট। জনবসতিপূর্ণ তারাবুনিয়া রাস্তা হয়ে চৈক্ষ্যং ইউনিয়নের মমপাখই হেডম্যান পাড়া, পুনর্বাসন পাড়া, কলারঝিরি, আবুল কাসেম পাড়া ও রোয়াম্ভু যাওয়ার জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রামীণ সড়ক।

প্রতিনিয়িত এবিএম ইটভাটায় ভারি যানবাহন চলাচলের কারণে সড়কটি ভেঙ্গে ধুলায় একাকার হয়ে গেছে। ভেঙ্গে গেছে সড়কের কালভার্টের ছাদ। ধুলা এবং কালভার্ট ভেঙ্গে যাওয়ায় চলাচলে দুর্ভোগে রয়েছেন বলে জানান স্থানীয় আব্দুল কুদ্দুস। তিনি বলেন, কোথাও অভিযোগ করে লাভ নেই। সকলেই ইটভাটার মালিকের কাছে জিম্মি।

চিমনি ভেঙে দিলেও থামেনি

গত বছরের শেষের দিকে বান্দরবান জেলা প্রশাসন অভিযান চালিয়ে অবৈধ ভাটার চিমনি গুঁড়িয়ে দিয়েছিল। টাঙানো হয়েছিল লাল সাইনবোর্ড। পরবর্তীতে চিমনীগুলো প্রতিস্থাপন হয়। এরপর প্রশাসন হয়ে পড়ে টুঁঠোজগন্নাথ।

এবিএম ইটভাটার ম্যানজার মোঃ আজিম বলেন, ‘ফসলী জমি খুঁড়ে আমরা ইটভাটার মাটি নিচ্ছি। সকলে জ্বালানী হিসেবে লাকড়ি ব্যবহার করে, আমরাও করছি। তিনি বলেন, আমার কোম্পানীর কাছে সকল কাগজপত্র আছে।’

স্থানীয় একজন লাকড়ি ব্যবসায়ী নামপ্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমি এক যুগের বেশী সময় ধরে লাকড়ি ব্যবসা করছি। অতীতের অভিজ্ঞতায় বলতে পারি এ বছর এবিএম ইটভাটায় কমপক্ষে ৭০ হাজার মন লাকড়ি পোড়ানো হবে। প্রতিমন লাকড়ি বর্তমানে এখানে বিক্রি হয় ১৫৫ টাকা। এরমধ্যে মনপ্রতি ৪/৫ টাকা সংশ্লিষ্টদের ‘ম্যানেজ’ করতে চাঁদা দেয়া লাগে।

ব্যবসায়ীদের হিসেবে আলীকদমের তিনটি ইটভাটায় চলতি মৌসুমে ২ লাখ ১০ হাজার মন লাকড়ি পুড়োনো হবে। যার আর্থিক মূল্য ১ কোটি ৮৫ লাখ টাকা।

ইটভাটায় লাকড়ি পুড়নো প্রসঙ্গে জানতে চাইলে লামা বন বিভাগের তৈন রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা মোঃ আবুল কাসেম বলেন, গত এক মাসে উপজেলার তিনটি ইটভাটায় ৫বার অভিযান চালানো হয়েছে। অভিযানে কয়েকশ’ মন লাকড়ি জব্দ করা হয়। উপজেলা পরিবেশ ও বন কমিটির বৈঠকে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

আইনে কী আছে
ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩ এর ৬ ধারায় উল্লেখ আছে, ‘কোন ব্যক্তি ইটভাটায় ইট পোড়ানোর কাজে জ্বালানী হিসেবে কোন জ্বালানী কাঠ ব্যবহার করতে পারবেন না’। আইনের ৪ ধারায় বলা হয়েছে, ‘জেলা প্রশাসকের নিকট হতে লাইসেন্স গ্রহণ ব্যতিরেকে কোন ব্যক্তি ইট প্রস্তুত করতে পারবেন না’। ৫নং ধারায় আছে, ‘কৃষিজমি বা পাহাড় বা টিলা হতে মাটি কেটে বা সংগ্রহ করে ইটের কাঁচামাল ব্যবহার করা যাবে না’। ‘স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর কর্তৃক নির্মিত উপজেলা বা ইউনিয়ন বা গ্রামীণ সড়ক ব্যবহার করে কোন ব্যক্তি ভারি যানবাহন দ্বারা ইট বা ইটের কাঁচামাল পরিবহন করা যাবে না’ মর্মেও এ আইনে উল্লেখ আছে। আইনের ৮ ধরার ৩ (খ) উপধারায় উল্লেখ আছে, ‘বিভাগীয় বন কর্মকর্তার অনুমতি ব্যতীত সরকারী বনাঞ্চলের সীমারেখা হতে ২ কিলোমিটার দুরত্বের মধ্যে ইটভাটা স্থাপন করা যাবে না’।

এ আইনের ১৬ ধারায় বলা হয়েছে, ‘এ আইন অমান্য করলে অনধিক ৩ বৎসরের কারাদ- বা অনধিক ৩ (তিন) লক্ষ টাকা অর্থদ- বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হইবেন’।

এ ব্যাপারে বুধবার সন্ধ্যায় আলীকদম উপজেলা নির্বাহী অফিসার জাবের মোঃ সোয়াইব এর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে বলেন, ‘আমি এ ব্যাপারে খোঁজখবর নিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।’