আলীকদমের ঠিকানায় ভূঁইফোড় মুক্তিযোদ্ধা : পার্বত্য জেলা পরিষদে মেয়ের চাকুরীর আবেদন


Momtaj Uddin Ahamad প্রকাশের সময় : অক্টোবর ২১, ২০২৩, ১১:৪৬ পূর্বাহ্ন /
আলীকদমের ঠিকানায় ভূঁইফোড় মুক্তিযোদ্ধা : পার্বত্য জেলা পরিষদে মেয়ের চাকুরীর আবেদন

প্রেসক্লাব ডেস্ক:
আলীকদমের ঠিকানায় ভূঁইফোড় মুক্তিযোদ্ধার এক সন্তান এবার বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের অধীনে অনুষ্ঠিত নিয়োগ পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছেন। কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার পূর্ব কাকারা ইউনিয়নের বাসিন্দা মৃত ছালামত উল্যাহ সম্প্রতি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন দাবী করে আসছে তার সন্তানেরা। তাকে আলীকদমের বাসিন্দা ও মুক্তিযোদ্ধা দাবী করে সম্প্রতি তার মেয়ে পার্বত্য জেলা পরিষদের অনুকুলে অনুষ্ঠিত ‘পরিবার কল্যাণ সহকারি (মহিলা) পদে (রোল নং ৬০) পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন।

তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, ১৯৭১ সালে তৎকালীন বৃহত্তর আলীকদম ইউনিয়নে কোন মুক্তিয্দ্ধু সংগঠিত হয়নি। ২০০৫ সালে আলীকদম উপজেলা প্রশাসন কর্তৃক ‘উপজেলা ডেভেলপমেন্ট প্রোফাইল’ তৈরী করা হয়। এ প্রোফাইলে ‘মুক্তিযোদ্ধাকালীন আলীকদম’ শীর্ষক লেখা ছাপা হয়। এ প্রোফাইলকে গ্রন্থে রূপ দিয়ে ২০০৮ সালের অমর একুশে বইমেলায় ‘প্রেক্ষণ: পার্বত্য চট্টগ্রাম গিরিনন্দিনী আলীকদম’ ইতিহাসগ্রন্থ প্রকাশ করেন আলীকদম প্রেসক্লাব সভাপতি মমতাজ উদ্দিন আহমদ।

এ গ্রন্থের লেখক মমতাজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘২০০৫ সালে উপজেলা প্রশাসনের অনুপ্রেরণায় আমি ‘ডেভলপমেন্ট প্রোফাইল তৈরী’ ও আলীকদমের ইতিহাস লেখার কাজ করার সময় ‘আলীকদমে মুক্তিযুদ্ধ’ নিয়ে অনুসন্ধান করি। তখন এলাকার প্রবীণ লোকজন জানিয়েছিলেন, ১৯৭১ সালে আলীকদমে কোন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না। যুদ্ধও সংগঠিত হয়নি।

তিনি বলেন, আমার লেখা ‘প্রেক্ষণ: পার্বত্য চট্টগ্রাম গিরিনন্দিনী আলীকদম’ বইয়ের ২৩ পৃষ্ঠায় ‘মুক্তিযুদ্ধে ব্যবহৃত স্থান’ শীর্ষক একটি অনুচ্ছেদ রয়েছে। তাতে আলীকদমে মুক্তিযুদ্ধ হয়নি এমন তথ্যই উল্লেখ আছে। তবে দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭২ সালে আলীকদমে মিত্র বাহিনী (ইন্ডিয়া ও ভূটান) আলীকদমে আগমণ করেছিলেন।

আলীকদমের ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক শ্রী উচ্চতমনি তঞ্চঙ্গ্যার লিখিত ‘গণপদচারণে আলীকদম’ আর্টিকেল থেকেও জানা যায়, আলীকদমে ১৯৭১ সালে কোন মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত হয়নি এবং স্থানীয় পর্যায়ে কোন মুক্তিযোদ্ধাও ছিলেন না।

এদিকে, চকরিয়ার কাকারা ইউনিয়নের বাসিন্দা মৃত ছালামত উল্যাহকে আলীকদমের চৈক্ষ্যং ইউনিয়নের বাজার পাড়ার বাসিন্দা সাজিয়ে সম্প্রতি তার সন্তানেরা মন্ত্রণালয় থেকে ‘মুক্তিযোদ্ধা’ হিসেবে সনদ সংগ্রহ করেন। যার গেজেট নং- ৭২, ক্রমিক নং- ৯২। বিষয়টি জানাজানি হলে স্থানীয় সচেতন নাগরিক, আলীকদমের ইতিহাস নিয়ে কাজ করা সাংবাদিক এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গরা বিস্ময়ে হতবাক হন।

স্থানীয়রা বলছেন, ছালামত উল্যাহ মুক্তিযুদ্ধ করলেও চকরিয়ার বাসিন্দা হিসেবে করেছেন। আলীকদমের ঠিকানায় মুক্তিযোদ্ধার সনদ সংগ্রহ করার অর্থই হচ্ছে, পার্বত্য জেলা পরিষদের নিয়োগে ‘সুযোগ’ নেয়ার উদ্দেশ্যে।

অনুসন্ধানে প্রকাশ, মৃত্যুর ১০ বছর পর ‘মুক্তিযোদ্ধা’র সনদ পাওয়া মৃত ছালামত উল্যার স্ত্রী মনোয়রা বেগম এর এনএইডি নাম্বার ২২১১৬৫৫৯৮৪২২২-এ স্থায়ী ঠিকানা লিখা রয়েছে ‘পূর্ব কাকারা, চকরিয়া, কক্সবাজার’। পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে যার নামে সনদ ইস্যু হলো তার স্ত্রীর এনআইডিতে কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে উল্লেখ রয়েছে।

এদিকে, ছালামত উল্যাহ জীবদ্দশায় গত ১৬/০৬/২০১৩ তারিখ ‘চকরিয়া সাব-রেজিস্ট্রী অফিসে’ সম্পাদিত দলিল নং- ৪৩৮৩-এ তার স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা উল্লেখ করেছেন ‘পূর্ব কাকারা, ৯নং ওয়ার্ড, ৭নং কাকারা ইউনিয়ন, উপজেলা: চকরিয়া, কক্সবাজার’।

এ দলিলের মাধ্যমে তিনি কাকারা মৌজা ও তহসিল অফিসের আওতাধীন ১৯৯৪ খতিয়ানের ০৫ শতক জমি হেবা করেছেন। একইভাবে চকরিয়া সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে সম্পাদিত দলিল নং- ৮৩৮৪ তারিখ ২৬/০৬/২০১৩ এর দলিলেও ছালামত উল্ল্যাহ তার স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা ‘পূর্ব কাকারা, ৯নং ওয়ার্ড, ৭নং কাকারা ইউনিয়ন, উপজেলা: চকরিয়া, কক্সবাজার’ উল্লেখ করেছেন।

অপরদিকে, মৃত ছালামত উল্যাহ তার এনআইডি নাম্বার ০৩১০৪৬৩২৪০৬০৫-এ ঠিকানা উল্লেখ করেছেন ‘বাজার পাড়া, ২৮৭নং তৈন মৌজা, ডাকঘর- রেপারপাড়া-৪৬৫০, আলীকদম, বান্দরবান’।

এ ঠিকানায় গত এক সপ্তাহ ধরে অনুসন্ধান করেও এ নামের কাউকে পাওয়া যায়নি। স্থানীয়রা জানান, এ নামের কারো ঘর বাড়িও নেই। তার পরিবার চকরিয়ার কাকারা ইউনিয়নে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। ছালামত উল্যাহ ১৯৭১ সালে চকরিয়ার কাকারার বাসিন্দা হিসেবে শাহ উমরাবাদ উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন।

সম্প্রতি বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদে অনুষ্ঠিত সহকারি শিক্ষক নিয়োগের পরীক্ষায় ছালামত উল্ল্যাহর এক মেয়ে ‘পরিবার কল্যাণ সহকারি (মহিলা) পদে (রোল নং ৬০) প্রক্সি পরীক্ষা দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

জানতে চাইলে আলীকদমের মুক্তিযোদ্ধা কমা-ার আব্দুল মান্নান বলেন, মৃত ছালামত উল্যার সন্তানেরা তাওে পিতাকে আলীকদমের বাসিন্দা দেখিয়ে মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন। মন্ত্রণালয় থেকে সনদ দেওয়ার কথা শুনেছি, তবে তিনি চকরিয়ার বাসিন্দা ছিলেন বলে আমি জানি।

আলীকদম উপজেলা নির্বাহী অফিসার জাবের মোঃ সোয়াইব বলেন, মৃত ছালামত উল্লাহকে মুক্তিযোদ্ধা সনদ ইস্যুর বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনের মতামত নেওয়া হয়েছিল কিনা আমার জানা নেই। বিষয়টি আমি শুনেছি। পরে খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।